Wednesday, July 28, 2021

এই জয় আনন্দের নয়। উল্লাসেরও নয়। অনেক আপোস আর দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে বাংলার রায় নিয়ে লিখছেন সুবর্ণা দাস ঘোষ


বলা হচ্ছে আমাদের রাজ্যবাসী ভিক্ষা নিয়েই খুশি। খুশি চপ শিল্পেই। বাংলার মহিলা মহল ‘শ্রী” প্রকল্প গুলো নিয়েই মেতে থাকতে চান। বাংলার স্টুডেন্ট রা ফোন আর সাইকেল নিয়ে দিব্যি সন্তুষ্ট। বাংলার শিক্ষিত বেকার রা বেকার ভাতা তেই উচ্ছ্বসিত, বেকার বিশেষন টি তাদের এতই প্রিয় যে তারা তা ত্যাগ করতেই বিশেষ আগ্রহী নন। সাধারণ মানুষ চায় না তাদের সন্তান এর জন্য সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা বরং বেঁচে নিয়েছেন কিছু শর্ট কাট সহজে পাওয়া সুবিধা। কাজ না করে দাসবৃত্তি ই বেছে নিলেন বাংলার মানুষ। আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায় অন্ধ এবং তাদের দায়িত্বজ্ঞান বর্জিত কাজের জ্বলন্ত উদাহরণ এই নির্বাচন। এই জয় অশিক্ষিত বাঙালির জয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।
বর্তমানে এই ভয়াবহ অতিমারীর পরিস্থিতিতে যখন সমগ্র কায়মনে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটছিল, রোজ সকালে পাওয়া বিভিন্ন পরিচিত মানুষের মৃত্যুর খবর যখন এক অদ্ভুত সময়ের সম্মুখীন করে দিয়েছে যেখানে মানুষের জীবন আর মৃত্যু দুটোই যেন বড় তুচ্ছ হয়ে গেছে, মানুষ একটু অক্সিজেনের অভাবে ছট্ফট্ করে শেষ হয়ে যাচ্ছে, মানুষের অকাল মৃত্যুও যেন আর অবাক করে না কাউকে। তখন সত্যি বলতে এই নির্বাচনের ফল নিয়ে একরকম নিরুত্তাপ ই হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু মানুষের এই সব এবং আরও কিছু অদ্ভুত বিশ্লেষণ আমাদের মত ভীত, সন্ত্রস্ত, সাবধানী সাধারণ মানুষের মুখে ও শব্দ এনেই দিচ্ছে।

রাজনীতি থেকে যোজন যোজন দূরে থেকেও যেহেতু রাজনীতির প্রভাব কে জীবন থেকে দূরে রাখতে ব্যর্থ হই তাই বলছি, বিজেপি বা তৃণমূল বা কোনো রাজনৈতিক দল কে অন্ধ ভাবে সমর্থন না করে ই বলছি। আসলে কিছু সহজ প্রশ্নের উদয় হচ্ছে মনে। বাংলার গরীব মানুষ, বাংলার মহিলারা, বাংলার স্টুডেন্ট, বেকার যুব সম্প্রদায়, শিক্ষিত কর্মজীবী মানুষ, বাংলার অভিভাবক কেউ ই যদি কিছু না বোঝেন তাহলে

- Advertisement -

বাংলার অভিভাবক কেউ ই যদি কিছু না বোঝেন তাহলে কাদের জন্য এই নির্বাচন? মানুষের জন্য নির্বাচন নাকি কিছু আগে থেকে তৈরি করা ভবিষ্যতবাণী কে বাস্তবায়িত করার গুরু দায়ভার কে সঠিক ও সম্পূর্ণ ভাবে স্থাপন করার একটা মাধ্যম নির্বাচন? বলা হচ্ছে অমুক দলের ভোট অমুক কে দিয়ে দিল কিছু বোকা মানুষ। কোনো দলের কি সত্যিই ওরকম নির্দিষ্ট করা ভোট থাকতে পারে? যেন আগে থেকে নাম লিখে রাখা হয়েছে? যদি তাই হতো তাহলে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই নির্বাচন হওয়া কেন? এটা কি কোনো নাটকের মঞ্চ যার স্ক্রিপ্ট কেউ আগে থেকে জনসাধারণ কে দিয়ে দিতে পারে আর তারা সেটা ঠিক করে পারফর্ম করতে বাধ্য হবে? হয়ত নয়।

আর আমার বিশ্বাস একসময় যে বাংলা কে পথ প্রদর্শক বলে সম্মান দিত গোটা ভারতবর্ষ সেই বাংলার মানুষ আসলে যে হাওয়াতেই গা ভাসান না কেন প্রকৃতপক্ষে ভেসে কিন্তু যান না। আসলেই আসল কথা গুলো ভালই বোঝেন। কতটা মিষ্টি আর কত তেতো গিলতে জানলে জীবনের সমীকরণ টা যথাযথ হয় বা অন্তত যথাযথ হওয়ার নিকটবর্তী হয় তা তারা ভালই বোঝেন।

যে বাঙালি আজকের দিনে দাড়িয়ে বিজেপি র মত একটা কেন্দ্রীয় দল কে জাস্ট পাত্তা না দিয়েই উড়িয়ে দিতে পারে তারা না অশিক্ষিত, না বোকা। বরং বাস্তববাদী ও বিচক্ষণ। তাদের ধৈয্য আর আত্মসংযম এতটাই যে তারা অচিরেই বিজেপি বা কেন্দ্র স্তরের হাই প্রোফাইল নেতাদের চোখ ধাঁধানো সভা তে হাজির হয়ে ও সময় মতো তা ভুলে যেতে পারেন। তারা লোকসভা আর বিধানসভা ভোটের তফাৎ তাও বোঝেন। সঠিক সময়ে সঠিক হিসেব করতে জানেন। প্রায় অসম্ভব ও অনিশ্চিত ভালোর সন্ধানে না গিয়ে মন্দের ভালো তে সন্তুষ্ট হতে পারেন। এটা লোভ বা মূর্খামি নয়। এটা সংযম। এটা দূরদর্শিতা।

কি হতো যদি আজ ফল টা উল্টো হতো?

যে দল আজ অবধি একটা যোগ্য মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী দিতে পারলো না, যে দল বাঙালির সেন্টিমেন্ট না বুঝে একটা স্লোগান কে বেশি প্রাধান্য দিল এবং শেষ অবধি সেটা কেও একটা খেলো পর্যায়ে নিয়ে গেলো, বাংলার মন না পড়ে আসলে তারা কি চায় না বুঝে সহজ আর সস্তার ছকে ধর্ম আর সম্প্রদায় নিয়ে এত গুটি সাজালো সেই দল এই রকম একটা মহামারীর সংবেদনশীল পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সবাই কে রাতারাতি বিশেষ লাভবান করে দিতেন কি ভাবে? ম্যাজিক করে? আর করা সেই ম্যাজিশিয়ান?  অন্য দল থেকে আসা কিছু সময় বুঝে রঙ বদলানো মানুষ আর কিছু দলীয় নেতা যাদের হাতে নির্বাচন প্রচারের ভার দিতেই কতটা কুণ্ঠা কেন্দ্র সরকারের তা স্পষ্টত দেখতে পাওয়া গেছে, যাদের দিকে মানুষ বহুদিন অবধি অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে থেকেছেন ও দেখেছেন এবং বিনিময়ে কিছু বিতর্ক আর রগরগে বিনোদন ছাড়া বিশেষ কিছু ই খুঁজে পাননি? কি নতুন  গড়তেন এনারা আর গড়ে কি সামাল দিতেন? নতুন করে কোন বিশেষ ভালোর সন্ধান দিতেন এনারা?মানুষ কেন এই গিনিপিগ হতে চাইবে? অন্তত এইরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যখন জীবন ই চরম সংকটের মুখে?

যত ই হট্টগোল করুক এই ভোট মানুষ ঠান্ডা মাথায় দিয়েছেন। এটা কোনো হটকারী সিদ্ধান্ত ও নয়। মানুষ সত্যিই চেয়েছিলেন বিজেপি সরকার সেই যোগ্যতা অর্জন করুন, নিজেদের কিছু ভুল কে সংশোধন করে বাংলা কে বুঝুন। মানুষ দেখেছেন তারা তা পারেননি। ডেইলি পেসেঞ্জারী করে সভা হয় কিন্তু রাজ্য চলে না। মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জি বা মি: শাহ কে ভালোবাসুন বা না বাসুন, আর ভরসা করুন বা না করুন দরকার পড়লে তারা হাতের কাছে হাজির হতে পারবেন না আর অন্তত তাদের ও সঠিক বিকল্প মানুষ রাজ্যে দেখতে পাননি। তাই প্রশান্ত কিশোর এর স্ট্র্যাটেজি তথা বাংলার নিজের মেয়ে পলিসি কাজ করেছে। “পাড়ার দাদা” রা অনেক ভালো, ভিন রাজ্যের “মহান নেতা’ দের থেকে,”রাত বেরাতে” দরকার পড়লে এরা তাও “আসলে ও আসতে পারে”…এই রকম একটা ব্যাপার কাজ করেছে।

আর কি বা উপায় ছিল? মানুষ কে ভাবতে হয়েছে যা আছে তাই থাক। কি আর করার। এই জয় যার ই হোক আমার বিশ্বাস এই জয়ের কারণ বিজেপি সরকার এর পরাজয়, পরিস্থিতি কে শান্ত ভাবে অনুভব করার অক্ষমতা। এই জয় এর কারণ উপযুক্ত অপশনের অভাব। মানুষ পশ্চিমবঙ্গ কে উত্তর প্রদেশ হতে দিতে চাননি। মানুষ গত এক বছরের সকল তিক্ত অভিজ্ঞতা কে ও মনে রেখেছেন। তাই যে দল মানুষের ভালো মন্দের উপর সাম্প্রদায়িকতা কে রেখেছে তাদের ভুল কে ঠিক করার এক্সপেরিমেন্টের পার্ট না হয়ে, আদেও তারা এখানে অন্য কোনো মানবিক সত্তার উন্মোচন করবেন কিনা এই জটিল কল্পনার গোলক ধাঁধায় না গিয়ে, প্রয়োজন থাকলে ও শেষ অবধি তাদের ত্যাগ করার বিচক্ষণতা দেখিয়েছেন।

কিন্তু এর মানে এটা ও নয় যে এই জয় ভীষণ গৌরবের। এত উল্লাস করার আগে একটু অন্তত আত্মবিশ্লেষণ প্রয়োজন। এই উল্লাস থেকে কোনো হিংসামূলক কার্যের আগে ও একটু ভাবা প্রয়োজন তারা আসলেই কোথায় দাড়িয়ে আছেন। যোগ্যতা তে জিতে নেওয়া আর অন্যের অযোগ্যতা তে কুড়িয়ে পাওয়া দুটো বিষয় বোধ হয় এক নয়। আসল খেলা কিন্তু মানুষ ই খেলে আর সবাইকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ও তারাই রাখেন। ঠিক যেভাবে চৌত্রিশ বছর পর ও মানুষ কোনও দল কে মুছে দিতে দু বার ভাবেন না। আর পরিস্থিতিই কিন্তু পরিবেশ তৈরি করে। বোধ করি এটা মেনে নিয়ে মনে রাখা প্রয়োজন যে মানুষ চাইলেও তৃণমূল সরকারকে ও মনের মধ্যে আর ততটা ঠাই দিতে পারেন না। যে ভালবাসা আর ভরসা নিয়ে একদিন দিদি কে পরম যত্নে মানুষ বুকের ভেতর বসিয়েছিলেন, তার সংগ্রাম কে মর্যাদা দিয়েছিলেন তারা কখনই সেই দিদির অধীনে থাকা দল টির মাথার উপর বসে হুকুম চালানো, প্রভুত্ব দেখানো বা বোকা বোকা মন ভোলানো বেশ কিছু অন্তঃসারশূন্য কাজকর্ম কে ভালো চোখে দেখেননি। তারা এই দলের সকল অনৈতিক পদক্ষেপ কিছু “শ্রী” প্রকল্পের লোভে ভুলে ও যান নি। অসংখ্য বেকার যুবক যুবতী তাদের কষ্ট করে অর্জিত শিক্ষার যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার, মাথা উচুঁ করে বাঁচতে না পারার বেদনাও হজম করে ফেলেন নি। বাংলার মানুষ কখনই দাসবৃত্তি কে ঘেন্নার সাথে অন্তর থেকে বর্জন করতে দু বার ভাবেন না। কিন্তু মানুষ বুঝেছেন এটা সঠিক সময় নয়। জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ এমন এক উভয় সংকটের মধ্যে সচেতন ভাবে এমন একটা পথ বাছতে হবে যেখানে অনিশ্চয়তা বা লোকসান থাকলে ও তুলনামূলক ভাবে কম। সরকারের প্রতি মানুষের এই অসন্তোষ আর অবিশ্বাস সবথেকে বেশি আমাদের নেত্রী ই অনুভব করেন বলে মনে করি। কারণ ওই পার্টির আর কার কি আছে জানি না কিন্তু ওই মানুষটির মধ্যে এখনও একটা সৎ মন কোথাও একটা খুঁজে পাওয়া যায়। তাই হয়ত মুখে নিশ্চিত জয়ের কথা বললেও বারবার তার মনের ভয়ের রিফ্লেকশন পাওয়া গেছে এবং জয়ের পর তার নিজের কথাতেও সেটা স্পষ্ট যে এতটা তিনি ও আশা করেননি।

এই জয় আনন্দের নয়। উল্লাসের নয়। অনেক আপোস আর দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে এর সাথে। মানুষ সত্যিই অনেক কষ্টে আছে। তাই এত নিন্দা করার আগে বা জয়ীর দলের ও আগামী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজের মানুষদের মন কে বোঝা প্রয়োজন। দুঃখ, কষ্ট, হতাশার রাশ কে শক্ত ভাবে ধরে সঠিক দিকে যাওয়া বড় কঠিন কাজ। অচেনা বিপদ থেকে চেনা দুর্ভাগ্য কে ভালো বলে গ্রহণ করা ও সহজ কাজ নয়। আজকের দিনে দাড়িয়ে দুঃখজনক ভাবে যা হয়েছে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল আর এই সূক্ষ্ম হিসেব টা যারা বুঝেছেন তারা মহিলা বা পুরুষ, স্টুডেন্ট, বেকার বা সাধারণ কর্মজীবী যাই হন  নির্বোধ, ভিখারী, লোভী বা অশিক্ষিত কোনোটাই নন।একজন সাধারন মানুষ হিসেবে এটুকু আমার বিশ্বাস।

আর সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রার্থনা ও একটাই সব কথার উর্ধ্বে মানুষ যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার পেছনে যুক্তি, তর্ক যাই থাকুক, কিন্তু যে টুকু ছিটে ফোঁটা অসহায় আশাটুকু অনেক কষ্টে মানুষ আজ ও একত্রিত করেছেন সেটার সম্মানটুকু যেন বজায় থাকে।

- Advertisement -
- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Popular Articles

error: Content is protected !!