স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা ছিল অভূতপূর্ব। ইতিহাসে সচরাচর এমন ভূমিকা নিতে কোন মহামানবকেও দেখা যায় না।  স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজি সরাসরি  অংশ নেন নি।কিন্তু গোটা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করছেন এমন মাত্রায় যে তাঁকেই “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পিতা”  বলে  বর্ণনা কর ছিলেন রাজা গোপালচারী। নেতাজি, অরবিন্দ, গান্ধী  নেহরু সহ স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল মহান নেতৃবৃন্দ স্বামীজিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ বলে বর্ণনা করেন।
নেতাজির ভাষায় , ” বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর পথ প্রদর্শক।আজ যা কিছু তিনি হয়েছেন সেটা স্বামীজির জন্যই।” অরবিন্দ বলেছিলেন, ” ভারতীয় জাতীয়তাবাদের রূপদান করেছেন স্বামীজি।তাঁর আগে যুব সমাজের কাছে কেউ দেশকে এমন মায়ের মতো করে তুলে ধরতে পারেন নি।স্বামীজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে শত শত যুবক প্রাণ দিয়েছিলেন। দেশমাতৃকার বেদীতে আত্ম বলিদান দিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন সহস্র যুবক স্বামীজির ডাকে। নেহরু তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন, সারা ভারতের যুব সমাজের মধ্যে আন্দোলন সৃষ্টি করেছিল স্বামীজির ভাষণ। বিশেষত স্বামীজি বিদেশে যে সমস্ত ভাষণ দিয়েছিলেন এদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের তা প্রকাশের পর প্রবল আলোড়ন পড়েছিল।  সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বার মতন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন  ত্বরান্বিত করতে স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা ছিল তাই প্রশ্নাতীত।

স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজি ছিলেন সর্বদা চরমপন্থী মতবাদের সমর্থক । সরাসরি ব্রিটিশের সঙ্গে লড়াই চেয়ে ছিলেন তিনি ।কোন আবেদন-নিবেদনের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না সে কথা তিনি বারবার বলে সতর্ক করে দেন।আসলে তিনি  বিশ্বাস করতেন না যে নরম পন্থায় ব্রিটিশ সরকার দেশ ছেড়ে চলে যাবে। তখনও যদিও  কংগ্রেসের নেতৃত্ব আবেদন নিবেদনের মাধ্যমে চলত। ব্রিটিশের কাছ থেকে  তাঁরা আলাপ আলোচনায় সুবিধা আদায় করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন । স্বামীজি এতেই অসন্তুষ্ট ছিলেন। সারদানন্দ স্বামীর সঙ্গে কংগ্রেস নিয়ে কথাবার্তাতে স্বামীজি বলেছিলেন, ভারতের লোক গুলো কংগ্রেস কংগ্রেস করে  মিছিমিছি হইচই করছে কেন? কতগুলো  হাও দা লোক এক জায়গায় জুটে গলাবাজি করলে কি কাজ হয় ? চেপে বসুক। নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করুক ।জগৎকে ডেকে বলুক আজ থেকে আমরা স্বাধীন হলাম, সমস্ত সরকারকে নিজেদের স্বাধীনতার ডিক্লেয়ারেশন পাঠিয়ে দিক।
সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিভিন্ন কথোপকথনে, চিঠিতে, আলোচনায়,তেমন কথা বলতেন। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে কোনো কারণেই তিনি পিছুপা হতে চাননি। তার জন্য যদি প্রাণ দিতে হয় তাতেও তিনি রাজি ছিলেন। তিনি বলতেন নিজে  আমার বুকে গুলি লাগে লাগুক,আমার রক্ত ঝরুক  তাতে ভারত জাগবে।  এমনকি নিজের কবিতাতেও তিনি কামান, বোমা ,বন্দুক, সহ যুদ্ধের বর্ণনা করেছেন। রণধ্বনি তার যেন উদ্দীপ্ত  আহ্বানে  ভেসে আসত ।

তিনি এইভাবে আগুনের  মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বারবার কখনো মিটিংয়ে বলেছেন।কখনো নিজের ভাষণে ( “আমার সমর নীতি “) , কখনো চিঠিতে ( নিজের ভাতৃপ্রতিম  মহারাজ বা শিষ্যদের প্রতি )  কখনো  দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য দেশবাসী এখনও উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারিনি। তাই তিনি প্রথমেই বলেছিলেন, স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে, নইলে স্বাধীনতা পেলেও তার সুবিধা নিতে পারবে না।তাঁর কথা:  এই লড়াই শুধু বোমা বন্দুক নিয়ে লড়াই নয় , উপযুক্ত হয়ে ওঠা দরকার প্রেম, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, এই তিনএর শক্তিতে । তিনি চেয়েছিলেন, উদার হৃদয়ের যুবশক্তি ভারতকে নেতৃত্ব দিক ।

তবুও তাঁর যুদ্ধটা শুধুমাত্র আক্ষরিক অর্থে গোলাগুলির যুদ্ধ ছিল না।  তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেক  যুবক আত্মিকশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠুক। স্পষ্টতই তিনি আত্মিক শক্তিতে কাজ  করবার জন্য, ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ” সাহসী হও, সাহসী হও, মানুষ একবার মাত্র মরে আমার  শিষ্যরা যেন কোনমতে কাপুরুষ না হয়।আমি তোমাদের মরতে দেখলে বড় খুশি হব, তবু তোমাদের লড়তে হবে। সেপাই এর মত আজ্ঞা পালনে জান পর্যন্ত কবুল কর।। নির্বাণ লাভ বরং করতে হবে না । ভীরুতাকে  আমল দেওয়া চলবে না।”

এইভাবে তার কন্ঠ সারা ভারতের যুব সমাজের মধ্যে  আগুনের  মত উদ্দীপনাসৃষ্টি করে। স্বামীজীর প্রভাব সেই আমলে যুব সমাজের মধ্যে কতখানি ছিল অজিত কুমার চক্রবর্তীর লেখা থেকে পাওয়া যায়। ১৯২৯ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়  “লোকহিত এর নতুন আদর্শ” নামে একটি প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ” সেই সময়ে ঘরে ঘরে বিবেকানন্দের ছবি থাকতো। বিবেকানন্দের সেবক সম্প্রদায় দেশের নানা জায়গায় পীড়িতদের সেবা করছে, শুশ্রূষা এবং দরিদ্রদের ধরণ করছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ যেকোনো কলেজ পড়ুয়া যুবককে জিজ্ঞাসা করো শুনিবে  যে বিবেকানন্দের প্রভাব তাহার উপর যেমন এমন আর কোন মানুষের নয়। বাংলাদেশে এখন বিবেকানন্দের পর্ব চলছে বললে অত্যুক্তি হয় না।”  সুভাষচন্দ্রও একই কথা লিখেছেন ১৯২৯এ  ” ১৫ বছর আগে তাঁর বাণী যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করে এমনভাবে যে স্বামী বিবেকানন্দের সেই প্রভাবে  তরুণ বাঙালি  সবকিছু জয় করিয়া স্বার্থপরতা এবং সকল প্রকার মলিনতা থেকে মুক্ত হইয়া আধ্যাত্বিক শক্তি বলে শুদ্ধ ও বুদ্ধ সুস্থ জীবন লাভের জন্য বদ্ধপরিকর হইত। সমাজ ও জাতি গঠনে স্বামী বিবেকানন্দ সর্বদা বলতেন “ম্যান মেকিং ইজ মাই প্যাশন । খাঁটি মানুষ তৈরি করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য।”

স্বামীজি চেয়েছিলেন সেই স্বাধীনতা সংগ্রাম যেখানে মানুষ খাঁটি হয়ে ওঠে। আজ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর  প্রশ্ন: আমরা  নিজেরাও কি খাঁটি উঠতে পেরেছি কি?

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!