চাকরির নামে রাজ্য সরকারের প্রহসন! এমন অভিযোগ মিডিয়ায়

প্রণব দাস

গত ১২ সেপ্টেম্বর নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নাকি ১১০০০ কারিগরী শিক্ষা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের চাকরির অফার লেটার তুলে দিয়েছেন। আগামী ১৫/০৯/২২ খড়্গপুরে, ২১/০৯/২২ দুর্গাপুরে,২২/০৮/২২ শিলিগুড়িতে একইরকম সরকারি অনুষ্ঠানে আরও ১৯০০০ জনকে চাকরির অফার লেটার দেওয়া হবে বলে সংবাদমাধ্যমে জানাচ্ছে। শিক্ষক দিবসে যে ৩০০০০ চাকরির ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন, সেটা দুধর্ষ-দুরন্ত গতিতে রূপায়িত হচ্ছে বলেই আনন্দবাজার, এই সময়, জি নিউজ, ২৪ ঘন্টা, প্রতিদিন ইত্যাদি প্রভৃতি সংবাদমাধ্যম তারস্বরে প্রচার করলো।

কিন্তু বাস্তবতা কী??? আমার ৫ জন ছাত্রছাত্রীর অভিজ্ঞতা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু খবর ও ভিডিও থেকে যা জানলাম, সেটাই বলি।

গতকাল (১২/০৯/২২) হাওড়া, হুগলী, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা – এই পাঁচ জেলা থেকে ১০১০০ জন কারিগরী শিক্ষা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের বাস বোঝাই করে ভিড় করানো হলো নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। জেলা পিছু খরচ করা হলো সাড়ে সাত লক্ষ টাকা। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা চলার সময় প্রদর্শনের জন্য স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো মমতা ব্যানার্জীর ছবি আর উৎকর্ষ বাংলার লোগো লাগানো হোর্ডার। মুখ্যমন্ত্রী এলেন। মাইক ধরলেন। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে নানান বাগাড়ম্বরের পর ছাত্রছাত্রীদের কাছে জানতে চাইলেন তারা অফার লেটারের ই-মেইল পেয়েছে কিনা। স্তব্ধ স্টেডিয়াম। কিন্তু অকুতোভয় ভঙ্গিতে তিনি বারবার জানতে চাইলেন। শেষে ছাত্রছাত্রীরা সমস্বরে জানালো – ‘না’। বিড়ম্বনা এড়াতে পোডিয়াম ছেড়ে মঞ্চজুড়ে পায়চারি করতে শুরু করলেন তিনি। তারপর আধিকারিকদের সাথে শলাপরামর্শ করে জানালেন ই-মেইল আজকে (১২/০৯/২২) থেকে যাবে। এই কথা শুনে ও মুখ্যমন্ত্রীর বিভ্রান্তি দেখে ছাত্রছাত্রীরা হাসি চাপতে পারলো না। এবার মুখ্যমন্ত্রী ফাইল দেখালেন, চিঠি দেখালেন, উৎকর্ষ বাংলার সাতকাহন গাইলেন, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব কৃষ্ণ গুপ্ত, মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীসহ আমলাদের উপর বিরক্তি প্রকাশ করলেন, দপ্তরের মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের চাটুকারিতা গ্রহণ করলেন। অতঃপর আজই (১২/০৯/২২) সকলকে অফার লেটার দিয়ে দেওয়া হবে, বাসে বাসে খাবারের প্যাকেটের (হুঁ হুঁ বাবা, মিও আমরের জবরদস্ত প্যাকেট) সঙ্গেই দিতে হবে অফার লেটার – আমলাদের উদ্দেশ্যে এই নির্দেশ দিয়ে তিনি মঞ্চ ছাড়লেন। ১৫ মিনিট পরে আমলারা অসহায় ভঙ্গিতে ফেরার বাস ছাড়ার হুকুম দিয়ে দিলেন। অফার লেটার সেই বাসে উঠতে পারলো না। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন – সংবাদমাধ্যম মুখ্যমন্ত্রীর পিছু পিছু বিদায় নিয়েই হেডলাইন লিখে দিলো। সারা পৃথিবী জানলো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ১১০০০ চাকরি দিয়ে দিয়েছেন। আরও দেবেন। মোট ৩০০০০। কিন্তু বাস্তবে যে অফার লেটার বাস মিস করেছে সেটা সংবাদমাধ্যম চেপে গেলো। ভোর চারটেয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত আটটায় বাড়ি ফেরা ছাত্রছাত্রীদের শরীরে ক্লান্তি, মনে একরাশ বিভ্রান্তি ছিল, কিন্তু হাতে অফার লেটার ছিল না। তবুও ক্ষীণ একটা আশা ছিল আজ (১৩/০৯/২২) হয়তো তার অফার লেটার পাবে। সারাদিন কাটলো বৃথা অপেক্ষায়।

তবে সব অপেক্ষারই শেষ আছে। এই অপেক্ষাও শেষ হলো আজ (১৩/০৯/২২) রাত ৮টা ৩৮ শে। অফার লেটার নিতে ওদের ডাক পরলো হুগলী নোডাল অফিসে। সেখানকার কর্মীরা রাতেও অন-ডিউটি। আগামীকাল (১৪/০৯/২২) সকাল ১০টার আগে অফার লেটার ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে তাদের দিতেই হবে (কারণটা শেষে বুঝবেন)। ওরা ৫ জন ছুটলো আজ (১৩/০৯/২২) রাতেই। রাত সাড়ে নটা নাগাদ ওরা হাতে পেলো বহুপ্রতিক্ষীত অফার লেটার।

কিন্তু লেটার খুলে তো ওদের চক্ষু চড়কগাছ। কোথায় চাকরি??? লেটারে লেখা আছে – সুজুকি মোটরস্ গুজরাট এবং ফানফিস্ট গ্লোবাল স্কিলার্স-এর যৌথ ব্যবস্থাপনায় ২ বছরের আইটিআই শিক্ষাক্রমে ট্রেনিং পার্টনার হিসেবে তাদের যুক্ত করা হচ্ছে। মাসিক স্টাইফেন পাবে ১১০০০টাকা। ওদের কোর্স ফিজ সুজুকি মোটর্স গুজরাট প্রাইভেট লিমিটেড বহন করবে। যে তালিকায় ওদের নাম আছে, সেখানে আরও ১০২ জনের নাম আছে। মোট ১০৭ জন।

এখানেই যন্ত্রণার শেয নয় এদের। চিঠিতে স্পষ্ট লেখা আছে ১১/০৯/২২ থেকে ১৪/০৯/২২-এর সকাল ১০টার মধ্যে গুজরাটের সুরেন্দ্রনগরে গিয়ে ওদের জয়েন করতে হবে। মানে হাতে চিঠি পাওয়ার ১২ ঘন্টার মধ্যে ২০৫০ কি.মি দূরে ওদের যেতে হবে জয়েন করতে। সাথে এটাও লক্ষণীয় জয়েনিং ১১/০৯/২২ থেকে শুরু হয়ে গেলেও শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জীর মুখ থেকে সরকারি মোচ্ছবের মাধ্যমে ঘোষণার জন্য মাত্র ১২ ঘন্টা আগে ( জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীর সেটুকু সময়ও পাবে না। কারণ ওদের পক্ষে ১৩/০৯/২২-এ ৮টা৩৮-এ খবর পেয়ে আর হুগলী নোডালে আসা সম্ভব নয়। ওরা এই অফার লেটার পাবে ১৪/০৯/২২ সকালে।) অফার লেটারের নামে প্রহসনপত্র তুলে দেওয়া হলো ছেলেমেয়েদের হাতে। আগামীকাল (১৪/০৯/২২) সকাল ১০টায় জয়েনিং-এর সময়সীমা শেষ, তাই তার আগেই বাধ্যতামূলক ভাবে অফার লেটার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

এই অবস্থায় আতান্তরে পরে ছাত্রছাত্রীরা চিঠিতে দেওয়া নম্বরে সেন্টার ইনচার্জ হিসেবে উল্লেখিত বেদপ্রকাশ সিং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সম্পূর্ণ চিঠিটাই ফেক বা ভুয়ো। চিঠিতে উল্লেখিত কোম্পানি আছে, তারা স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য আইটিআই-এর কোর্স করান, সুজুকি মোটর্সের সাথে তাদের টাইআপ আছে, নিযুক্তদের তারা এই লেটারহেডেই চিঠি পাঠান – এগুলো সবই সত্যি। কিন্তু লেটার হেডটি রঙিন হয় – এই রকম সাদাকালো নয়। এক্ষেত্রে তাদের লেটারহেড অন্যায় ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!