স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজীই জ্বালিয়ে ছিলেন জাতীয়তাবোধের অগ্নিশিখা


সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়


স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজীর সবচেয়ে বড় দান হচ্ছে জাতীয়তাবাদের এবং জাতীয়তাবোধের একইসঙ্গে উন্মেষ।সাধারণত  ন্যাশনালিজম  বলে আমরা যা বুঝি তার বাংলা মনে হয় জাতীয়তাবাদ।কিন্তু স্বামীজির দৃষ্টিভঙ্গিতে  জাতীয়তাবাদ নয় জাতীয়তাবোধ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার কাছে  দেশ মা জননীর মতো, আর এই দেশের প্রতিটি মানুষ সেই জননীর সন্তান  যারা পরস্পর ভাতৃত্ববোধে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধন এ রয়েছে।এবং সেই বোধ থেকে জাতীয়তাবোধের জন্ম। সকলেই মনে করবে যে ভারত মাতার সন্তান, স্বামীজি র এই ধরনের যে জাতীয়তাবোধ তার মধ্যে থেকে জনজাগরণ এনেছিলেন বিশেষত সেই সময়কার তরুণ সমাজের মধ্যে। এমনকি সমসাময়িক যারা ব্যক্তিত্ব তারাও স্বামীজীর এই ভাবনায় উদ্বেলিত হয়ে জাতীয় সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ব্রহ্মনন্দম উপাধ্যায় এর মত একজন বিখ্যাত তৎকালীন নেতা বলছেন ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে স্বামীজীর মৃত্যুর চার বছর পর বিবেকানন্দ আমার চোখ খুলে দিয়েছে, যদি  ও  সে ছিল আমার বন্ধু,  আমার সহপাঠী, আমার সমবয়সী,  তবু ভাবীআমার গুরু বলে, আমার চৈতন্য দাতা বলে ভেবে, আমি গর্ব অনুভব করি।বিবেকানন্দকে আমি একজন ব্যক্তি  হিসাবে দেখিনা। দেখি  দেশপ্রেম  এর একটি অতিকায় জ্বলন্ত অগ্নিশিখা রূপে। যে অগ্নিশিখা থেকে একটা স্ফুলিঙ্গ ছিটকে আমার বুকের মধ্যে প্রবেশ করেছিল, তার ফলে আজ তোমরা আমাকে এখানে দেখছো। এই ব্রহ্মনন্দম বিবেকানন্দের সৃষ্টি। শুধু আমি নয় আমার মত অনেকেই  স্বামীজীর প্রভাবে নবজন্ম লাভ করেছে। উই আর অল প্রডাক্ট অফ স্বামীজি ইনফ্লুয়েন্স, এর চাইতে বড় কথা আর হয় না। এই একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনেছি পরবর্তীকালে নেতাজি র কন্ঠে, শুনেছি এমনকি গান্ধী, নেহেরু, র কন্ঠে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাবিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ বলছেন স্বামীজীর সঙ্গে থাকায় তার সাক্ষাৎ জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ওই দুর্লভ দর্শন এবং তার আশীর্বাদ অনুপ্রেরণা লাভের সৌভাগ্য তাদের জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল। তার নিজের কথায় আমার সঙ্গী ছিল বাছাই করা কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু,  যেমন শিরীষ চন্দ্র পাল, আলিম উদ্দিন আহমেদ  প্রভৃতি।সব  শুদ্ধ আমরা ছিলাম ১০ ১২জন, তাদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার যে ওই দলের প্রত্যেকে পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছিল  এক এক জন জন দুর্ধর্ষ  মুক্তি সংগ্রামী। যুগনায়ক এর সঙ্গে আমাদের সেই সাক্ষাৎকার শুধু আমার জীবনের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথ কে উন্মুক্ত করে দেয় নি আমাদের সেই বন্ধু গোষ্ঠীর সকলেরই  করেছিল। আমাদের সকলের কাছে এসেই সাক্ষাৎকার যেন একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।তখন থেকেই প্রকৃতপক্ষে আমি এবং আমার বন্ধু রা সবাই দেশের মুক্তির জন্য নিজেদের উৎসর্গ করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ছিলাম।১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে আমরা কয়েকজন ঢাকায় মুক্তি সংঘ গঠন করেছিলাম, যা পরে বৃহৎ আকারে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এ রূপান্তরিত  হয় ব্যাপক কর্মসূচী কল্পনার ভিত্তিতে।সুতরাং  মুক্তি সংঘ এবং পরবর্তীকালে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার এর প্রকৃত অর্থে জন্মলাভ হয়েছিল তখন যখন স্বামীজীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে র সৌভাগ্য আমরা পেয়েছিলাম। স্বামীজীর সঙ্গে আমাদের ওই সাক্ষাতের আগে আমরা ছিলাম বন্ধু, ফ্রেন্ড, কিন্তু তারপর থেকে আমরা হলাম একই আদর্শে বিশ্বাসী, এবং একই সঙ্গে উৎসর্গকৃত মরমের সহিত।স্বামীজীর প্রেরণা আমাদের প্রত্যেককে একটি অখন্ড এবং অচ্ছেদ্য বন্ধন সূত্রে  চিরকাল এর জন্য বেঁধে দিয়েছিল, এই ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এক একটি ছোট ছোট দলের নতুন নতুন যুব গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি দেখা করতেন, এবং একেকটি সাক্ষাতের পর সেই যুব গোষ্ঠী অগ্নি স্ফুরাণ এ পরিণত হতো। হেমচন্দ্র
ঘোষের নেতৃত্বে সেইসময় বাংলা সশস্ত্র আন্দোলনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, ব্রিটিশের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল একের পর এক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে । বাংলা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদের ত্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।সেই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স এর ব্যাপক আন্দোলনের পেছনে ছিল স্বামীজির অসাধারণ প্রেরণা, হেমচন্দ্র ঘোষ বলছেন এখনো আমার কাছে মাঝে মাঝে একটা রহস্য বলে মনে হয়  যে কেন , কী জন্য বিবেকানন্দ আমাদের জন্য এতখানি করলেন? কারণ আমি তো জানি স্বামীজির সেই দুর্লভ অনুগ্রহ পাওয়ার কোন যোগ্যতা আমাদের ছিল না। এ পর্যন্ত তার সম্পর্কে যা পড়েছি বা জেনেছি তাতে আমার মনে হয় ভারতের জন্য তাঁর অপরিসীম উদ্বেগ এবং দেশের তরুণ ও যুবকদের ওপর আস্থা ছিল অপরিসীম।। যাদের তিনি জাগ্রত দেখতে চেয়ে ছিলেন । তিনি লিখছেন, আমরা যতই অযোগ্য হই না কেন এটাতো ঘটন বিবেকানন্দ নামক বিরাট আগ্নেয়গিরির ক্ষুদ্রতম স্ফুলিঙ্গ ছিটকে এসে আমাদের সত্তায় প্রবেশ করেছিল। সেই মহা আগুনের অনু মাত্র যদি কারোর মধ্যে কোন একবার প্রবেশ করে তাহলে তা কখনোই নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে পারবে না। যে ব্যক্তি ওই স্ফুলিঙ্গের সম্বন্ধে অবহিত হন বা না হন একদিন না একদিন দেখা যাবে সেই স্ফুলিঙ্গের একদিন বিস্তৃত হতে হতে তার সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছে আর ঠিক তাই হয়েছিল আমাদের ক্ষেত্রে।ভারতের স্বাধীনতা যারা ছিনিয়ে নিয়েছিল মুক্তি সংঘ অথবা বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ভারত থেকে তাদের দূর করে দেওয়ার ব্যাপারে সামান্যতম ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে, তার মুখ যদি ভারত থেকে ব্রিটিশদের দূর করে দেওয়ার ব্যাপারে সামান্যতম ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে তবে তার মূলে ছিল সেই আগ্নেয়গিরি থেকে সেই বিরাট আগুন থেকে ছিটকে আসা কয়েকটা স্ফুলিঙ্গ। যেগুলি একদিন গুটিকয়েক কিশোর এবং তরুণীর বুকের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। এবং যেগুলি নিঃসন্দেহে পরবর্তীকালে তাদের অকুতোভয় মুক্তির দুঃসাহসিক অভিযানে ব্রতী করেছিল। বিপ্লব পথের সেই নির্ভীক অভিযাত্রীদের ভবিষ্যৎ স্বামীজি তখনই প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!