সংকট থেকে বিপুল সম্ভাবনা : ইছামতির কচুরিপানা থেকে স্বনির্ভরতা হাজার হাজার মহিলার !! চমক পৌরপিতার

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সংকট থেকে কি করে সম্ভবনা তৈরি করা যায় সেটা অবিশ্বাস্য মৌলিক উদ্ভাবনী ক্ষমতায় দেখিয়ে দিলেন বনগাঁ পুরসভার বর্তমান পৌরপিতা গোপাল শেঠ মহাশয়। উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে অসামান্য নিদর্শক হিসেবে তাঁকে পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। যে অসাধারণ উদ্যোগ নিয়ে তিনি পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়নকে মিলিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে জুড়েছেন তাতে বাংলায় এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই। মৃতপ্রায় ইছামতির কচুরিপানা তুলে তার থেকে তৈরি হচ্ছে থালা, বাটি, ব্যাগ,এমনকি রাখি ও। এতে হাজার হাজার আর্থিক দিক থেকে দুর্বল মহিলাদের স্বনির্ভরতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইছামতির দিকে তাকালে যখন দেখা যায় সমস্ত জলকণা ঢেকে গেছে অসংখ্য কচুরিপানায়, যেকোনো মানুষের তখন বিপন্ন নদীর ঐ রূপ দেখলে বুকে হা হুতাশ জাগবে। পৌর পিতা নিজে নদীপাড় এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় নিত্যই নদীর সেই রূপ দেখতে দেখতে প্রতিদিন পুরসভায় আসেন। একদিন পৌরপিতা হওয়ার পর তাঁকেই এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় ইছামতির কচুরিপানায় বানানো টুপি দিয়ে। রাজনৈতিকদিক থেকে অন্য কেউ হয়ত এটাকে প্রশাসনিক ব্যর্থতার রূপক তামাশা বলে ভাবতে পারতেন, কিন্তু গোপালবাবু সাদা মনের মানুষ। তিনি মানুষের সঙ্গে থাকেন। মানুষের আবেগকে নিয়েই তাঁর পথ চলা। তাই টুপি তুমি কার? এই প্রশ্ন না করে তিনি কচুরিপানা নিয়েই নদী ও মানুষের সমস্যা একইসঙ্গে যুগপৎ মেটাতে চাইলেন! মাথায় খেলে যায় এক অসীম সম্ভাবনার ভাবনা। কচুরিপানা দিয়ে একটার পর একটা জিনিষ তৈরি করার ভাবনা নিলেন। যেভাবে শাল পাতা, থার্মোকল দিয়ে বানানো হয়, তিনিও এই ক্ষেত্রে দক্ষ প্রশিক্ষকের সাহায্যে কচুরিপানায় বাণিজ্য সম্ভাবনা খুঁজে পেলেন। কিন্তু বনগাঁর মানুষ ভাবতে পারে নি কোনোদিন যে ইছামতির বুক থেকে তুলে আনা কচুরিপানা থেকে তৈরি রাখি তারা নিজেরাই পরবেন!শুধু তাই নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট, জার্মান চ্যান্সেলর সহ বিশ্বের বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য কচুরিপানায় তৈরি রাখির বাক্স পাঠিয়ে টাক লাগিয়ে দিয়েছে বনগাঁ পৌরসভা।

কিন্তু কেউ না ভাবলেও এমনটাই কথা ভেবে নিয়েছিলেন গোপাল শেঠ। যেমন ভাবা তেমনি শুরু হয়েছিল কাজ। বনগাঁ পুরসভা পরিচালিত মা ক্যান্টিনের দোতালায় তিনি চালু করেন প্রয়োজনীয় ট্রেনিং। “কচুরিপানা থেকে সোনা”এই স্লোগানে একটার পর একটা পণ্য তৈরি করবার ট্রেনিং দিতে থাকেন বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের। বনগায় কমপক্ষে এরকম এক হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী মহিলা কচুরিপানা থেকে বিভিন্ন বস্তু তৈরির প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে জানা গেল। এই মুহূর্তে ৫০০ গোষ্ঠী প্রায় হাজার দশেক মহিলা পুরসভার এই প্রকল্পে যুক্ত হতে পেরে ধন্য। মাত্র এক সপ্তাহে তাদের মাথাপিছু প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে রোজগার শুরু হয়ে গেছে। না কোন পুঁজি বা প্রশিক্ষণ ফি! কোনো রকম খরচ ছাড়াই বনগাঁ এবং তার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা এখন সর্বক্ষণ ব্যস্ত নদী থেকে কচুরিপানা তুলে তাকে শুকিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে দিয়ে নানা রকম জিনিস তৈরিতে।তাঁরা জানালেন,এই কাজে তাঁরা এতটা সহজে আয় পাচ্ছেন যে এমন ভাবে আয় আসলে তাঁরা নিজেরাই সংসার চালাতে পারবেন।আর স্বামীর আয়ের উপর নির্ভর করতে হবে না।এই কথাটা যখন বলছেন, তখন তাঁদের চোখে মুখে এক নতুন স্বাধীনতার স্বাদ যেন তাঁরা পেতে চলেছেন। যেন তাঁরা মুক্তির স্বাদ পাচ্ছেন খুব শীঘ্রই, চোখে মুখে এতটাই প্রত্যয়

পুরসভার যোগ্য নেতৃত্বে কচুরিপানা থেকে তৈরি নির্মিত বিভিন্ন বস্তু দ্রুত বাজার পাচ্ছে। দেশে এবং বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও প্রবল। কচুরিপানা বলে হাতে দিলেও মনে হবে না, মনে হবে মোটা থ্রেডের প্লাস্টিক। দেখতে যেমন সৌন্দর্য তেমনি টেকসই। জুট ব্যাগ এবং ঘর সাজানোর বস্তু বানানো যেতে পারে কচুরিপানা থেকে তৈরি ব্যাগ, এতটাই সম্ভাবনাপূর্ণ এই শিল্প হয়ে উঠতে পারে।
ফলে বনগাঁর ঘরে ঘরে এই শিল্প ছড়িয়ে পড়বার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনের বাংলার অন্যতম সুন্দর একটা হস্তশিল্পের নিদর্শন হয়ে উঠতে চলেছে কচুরিপানা থেকে তৈরি এই সমস্ত বস্তু। বনগাঁ পৌরসভা চাইলে পুরএলাকার সমস্ত বাজারে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করে কচুরিপানা থেকে নির্মিত ব্যাগের ব্যবহার চালু করতে পারে। প্রয়োজনে ব্যাগ নির্মাণের খরচ কমাতে আরো বড় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।যান্ত্রিক সহযোগিতা নিয়ে এই ধরনের কাজে অংশ নেওয়ার যায় কিনা সেটাও ভাবার প্রচুর অবকাশ রয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!