রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যশোবন্ত : বামের কি করা উচিৎ ছিল?

বিজয় পাল

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রাক্তন বিজেপি মন্ত্রী ও নেতা যশবন্ত সিনহা’র সম্মিলিত বিরোধী প্রার্থী মনোনীত হওয়া নিয়ে অনেক বামপন্থী বন্ধুরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের প্রশ্নগুলো মোটেই অবান্তর নয়। আবার তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এমনও নয়। সাধারণভাবে সাদা চোখে যে প্রশ্ন তোলা যায়, যে প্রশ্ন আসবে বলে বোঝা যায় তেমন প্রশ্নই তোলা হয়েছে। কী প্রশ্ন?
১) প্রাক্তন বিজেপি নেতা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক হতে পারে?

২) এটা আর এস এস’র চাল। যেই জিতুক সে আর এস এস’র লোকই হবে। সেই চালে বামপন্থীরা আটকে গেল! স্বভাবতই হায় সিপিএম হায় সিপিএম রব উঠেছে। আগেই বলেছি, এই রব ওঠাটা দোষের কিছু নয়, স্বাভাবিক এবং এটা সিপিআইএম – এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে। বোঝা যায় যে, তাঁরা পার্টিকে কতটা ভালোবাসেন এবং অন্য সব পার্টি থেকে আমাদের পার্টিকে কতটা আদর্শনিষ্ঠ মনে করেন।

৩) বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া নেতাকে সমর্থন করায় তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির বোঝাপড়া করে চলার বাস্তব সত্য আড়ালে চলে গেল। বিজেপি বিরোধিতায় মমতা ব্যানার্জি চ্যাম্পিয়ান হয়ে গেলেন। তাঁর চালে সিপিএম কুপোকাত হয়ে গেল।

৪) বিজেপিকে হারাতে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা সিলমোহর পেয়ে গেল।
লক্ষ করলে দেখবেন, আর এস এস লবি এই বক্তব্য সমর্থন করছে। তারা এই বোঝাপড়ায় তোল্লা দিচ্ছে।
বামপন্থী যাঁরা এই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের সমাধান সূত্র কী? এই রকম;

১) বামেরা আদর্শগত অবস্থান অটুট রাখতে আলাদা ‌প্রার্থী দিক।
২) এই ভোট বয়কট করুক।
এবার আসুন, একটু বুঝে নিতে চেষ্টা করি।

১) আচ্ছা, এই ভোটে সংখ্যার বিচারে জয় সম্পর্কে বিজেপি নিশ্চিত তো নয়ই বরং বিরোধী ভোট ভাঙাতে না পারলে বিজেপি প্রার্থীর হেরে যাওয়ার কথা। এমন অবস্থায় যারা মনে করছেন দুই প্রার্থীই আর এস এস’র লোক তাঁদের জন্য বলছি,তাহলে বিরোধী প্রার্থীকে বিজেপি সমর্থন করলেই তো আর ঝামেলা থাকে না। তাতে বরং নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তিনি বলতে পারবেন,শাসক দল হয়েও ঐক্যমতের স্বার্থে বিরোধীদের মনোনীত প্রার্থীকেই আমরাও মেনে নিচ্ছি। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে পারবেন। তাই করছেন না কেন? তুলুন না এমন আওয়াজ। উঠুক আওয়াজ যে, বিরোধীদের ভুল পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে বিরোধী প্রার্থী যখন নিজের দলেরই লোক তখন তাকে সমর্থন করে ইতিহাসে মহান হওয়ার বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে মোদী ‘ঐতিহাসিক ‘ ভুল করলেন। ‘মাস্টার স্ট্রোক ‘ দেওয়ার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হলেন মোদী।

২)যশবন্ত সিনহা ধর্মনিরপেক্ষ? উত্তর হল , বিজেপি বিরোধী সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্যান্য শক্তি তার নামে ঐক্যমত হয়েছে। তিনি ঘোষিত ফ্যাসিস্ট আর এস এস মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজি হয়েছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রথম এমনকি দ্বিতীয় পছন্দও নয় জেনেও রাজি হয়েছেন। তিনি যেমন বিজেপির নেতা, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিজেপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন আবার এটাও ঠিক নরেন্দ্র মোদীর স্বৈরাচারী , সর্বক্ষেত্রে মারমুখী ও কর্পোরেটমুখী কাজের বিরোধিতা করে বিজেপি ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে মোদী সরকারের কাজের বিরোধিতা করে চলেছেন, তার বিরোধিতার মধ্যে সংবিধান,ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘুদের রক্ষার ইস্যু লক্ষ করা গেছে। প্রার্থী হওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি বলামাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং দলীয় সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘদিন বাম আন্দোলনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি বেশ মানিয়ে গুছিয়ে মোদী পরিচালিত বিজেপি করছে , এমন উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে। তাহলে এর উল্টোটা হতে পারে না,কে বলতে পারে? এর মানে এই বলা হচ্ছে না , যে তা হবেই। দীর্ঘদিন কংগ্রেস করা শীর্ষস্থানীয় নেতা ভি পি সিংহ দুর্নীতির প্রশ্নে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমৃত্যু যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা কংগ্রেস ঘরানার তীব্র বিপরীত ছিল শুধু নয়, অনেক প্রশ্নে বামপন্থী চিন্তার আধার বেশি ছিল। তাই যশবন্ত সিনহা কত শতাংশ বিশ্বাসযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও মোদী – জমানা বিরোধী শক্তির প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়েছেন এবং সেই মর্মে লিখিত বয়ান দিয়েছেন প্রকাশ্যে।( যুক্ত করা হল) ।
এই অবস্থায় আমাদের কী করা উচিত ছিল? মোদী পরিচালিত বিজেপিকে হারাতে সমস্ত বিরোধী ঐক্যে সামিল না হয়ে বেরিয়ে আসা? তাহলেই তো পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্তের নির্দেশের বিপরীত কাজ করা হত। যা করা হল তার অর্থ কী? বিজেপি বিরোধী সম্ভাব্য বৃহত্তম শক্তিকে একজোট করতে পারা। হ্যাঁ, ফারুক আবদুল্লাহ বা গোপালকৃষ্ণ গান্ধী রাজি হলে অনেক বেশি ভালো লাগত। যদিও গোপালকৃষ্ণ গান্ধী হলেও পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া নানা অবান্তর কথা তুলে ধরত এবং বামমনস্ক অনেকেই সেগুলো উগরে দিত।

৩) তৃণমূল কংগ্রেসের আ্যডভান্টেজ ? মমতা ব্যানার্জির কৌশল মাঠে মারা গেল। বাহবা নিতে গিয়ে কারও সঙ্গে কোনরকম প্রাক আলোচনা না করেই তিনি এককভাবে দুম করে একটি সভা ডেকে শারদ পাওয়ারের নাম প্রস্তাব করে দিলেন। শারদ পাওয়ার মুখের ওপর না বলে দিলেন। পরের কোনো নামই মমতা ব্যানার্জি প্রস্তাবিত নয়। সে কারণে দ্বিতীয় সভায় তিনি নিজে না গিয়ে ভাইপোকে পাঠালেন।

৪) তাঁর বিজেপি বিরোধিতা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না?
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বোঝাপড়া কোনো একটি ইস্যুর বিষয় নয় এটা পারস্পরিক স্বার্থে ও শ্রেণিস্বার্থে। তাই একটা ঘটনায় এটা প্রতিষ্ঠিতও হয়নি, একটা ঘটনায় উবেও যাবে না। তাছাড়া পিকচার আভি বহুত বাকি হ্যায়। সিবিআই আজ পর্যন্ত ডাকাডকি ছাড়া কিছুই করেনি। বিচারপতি চরম অসন্তুষ্ট। সেটিং- এ প্রেসার গেম চলছে। বিজেপি নিজে কতটা বাড়তি ভোট জোগাড় করতে পারে দুই তরফে নজর রাখা চলছে। শেষমেষ কী হয়‌ দেখার অপেক্ষা। মোদীর কত ভোট কম পড়ে। তার ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের কতোজন ভোটের দিন ‘গুরুতর অসুস্থ ‘ হয়ে হেথা হোথা ভর্তি হন, কতজন চোরাই ক্রস ভোটিং করেন,দেখতে হবে না! তারপর তুরুপের তাস তো রয়েছেই। ‘ অমুক ‘ দল বা ‘ অমুক’ নেতার ‘ অমুক ‘ আচরণে, ‘ অমুক ‘ অবস্থানে, বিবৃতিতে… চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে আমরা এই জোট থেকে সরে আসতে বাধ্য হলাম।
আগাম অনুমান করা দুরূহ। তবে ‘ ল্যাংটার নেই বাটপারের ভয় ‘ বা ‘ দু’ কান কাটার আবার লজ্জা কী ‘ ! তাই বলছিলাম, তৃণমূল নেত্রীর মাস্টার স্ট্রোকে সিপিএম চাপে না সিপিএম-এর মাস্টার স্ট্রোকে নেত্রী মহাচাপে দেখার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

৫) আচ্ছা বলুন তো, যশবন্ত সিনহা যদি জিতে যান,বা হিসেবের অতিরিক্ত ভোট পান, দেশের মানুষের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে! নরেন্দ্র মোদী কতটা বিচলিত হবেন? কে না জানে, দলের অভ্যন্তরে মোদী – শাহ্ বিরোধী এক বিরাট শক্তি আছে যারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারার জন্য মুখিয়ে আছে। ভেতরের এই শক্তির কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নিঃসন্দেহে যশবন্ত সিনহা। সেই ভয় কী প্রবল চাপে রাখছে না মোদী- শাহ্ জুটিকে? শাসকের মধ্যে ফাটল ধরানো‌র ন্যূনতম সুযোগ, ন্যূনতম সময়ের জন্য হলেও তার ব্যবহার করার সক্ষমতা না থাকলে সে পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারে না — এই হচ্ছে চিরায়ত মার্কসবাদী শিক্ষা।

৬) বামেরা আদর্শগতভাবে আলাদা ‌প্রার্থী দিল না কেন? যেমন লক্ষ্মী সায়গলকে প্রার্থী করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রধান কাজ। আজকে বামেদের সংসদীয় শক্তি স্বাধীনোত্তর কালে সর্বনিম্ন ‌। দেশের মৌলিক কাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার অশ্বমেধের ঘোড়া টগবগিয়ে ছুটছে‌। এমন সময় সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য ত্যাগ করা কী চরম নির্বুদ্ধিতা হত না?

৭)ভোট বয়কট? এর চাইতে বিজেপি – সহায়ক কাজ আর কী হতে পারে? যখন পার্টির প্রধান কর্তব্য আর এস এস পরিচালিত বিজেপিকে বিচ্ছিন্ন করতে ও পরাস্ত করতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শক্তির সমাহার ঘটানো।

৮) ‘ নো ভোট টু বিজেপি ‘ বা বিজেপিকে হারাতে বামেদের পরিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের বক্তব্য মান্যতা পেয়ে গেল?
তৃণমূল কংগ্রেস তো পশ্চিমবঙ্গের এজেন্ডা‌ । রাষ্ট্রপতি ভোট সর্বভারতীয় বিষয়। তাই সর্বভারতীয় বিষয়ের সঙ্গে রাজ্যের ইস্যু গুলিয়ে ফেলা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এক জোটে বা ফোরামে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএম রয়েছে এমন কল্পনা কেউ করতে পারেন, কিন্তু সিপিআইএম – এর বোঝাপড়ার সঙ্গে তার মিল নেই।

৯)এটা একটা সুবিধাবাদ?
উত্তর হল, না। ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের একটি নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ। সে আলোচনা অন্য প্রসঙ্গে হতে পারে। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, এতো বহুমাত্রিক বিভিন্নতা নিয়ে এতো জাতি ,ধর্ম, ভাষা , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের দেশ আর কোথায় আছে? তার ওপরে ভারত একটি প্রজাতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার দেশ। তাই তো এতো আঞ্চলিক দল, এতো রাজ্যে আলাদা আলাদা ইস্যুতে, বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা আলাদা সরকার গঠন আর কোন দেশে আছে? তাই এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যে শুধু নয়, বিভিন্ন রাজ্যে একই দলের সঙ্গে আর একটি দলের অবস্থানের বিভিন্নতা অনিবার্য। আর এটা নতুন কিছু নয়। কংগ্রেস বা অন্য দলের সঙ্গে সিপিআইএম এর এমন বিভিন্ন অবস্থান রয়েছে শুধু তাই নয়,কেরলে এই মুহূর্তে ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি বাম গণতান্ত্রিক জোটে নেই। রয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে। সবশেষে মার্কসবাদীদের জন্য আর একটি চিরায়ত শিক্ষার কথা তুলে ধরে লেখা শেষ করব। তা এইরকম। কী করা উচিত এই নিয়ে যখন বিভ্রান্তি চরমে তখন অন্য সব চিন্তা,যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে তাকিয়ে দেখুন -- আপনি যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে চাইছেন তারা কি আপনার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়,তাহলে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি ঠিক অবস্থান নিয়েছেন। ‌ সকল বামমনস্ক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে আহ্বান, আসুন পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও গভীরতা বিবেচনা করে সকলে একজোট হই। বিজয় পাল ২৪. ০৬. ২২ বেলা: ১১.৪২.

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রাক্তন বিজেপি মন্ত্রী ও নেতা যশবন্ত সিনহা’র সম্মিলিত বিরোধী প্রার্থী মনোনীত হওয়া নিয়ে অনেক বামপন্থী বন্ধুরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের প্রশ্নগুলো মোটেই অবান্তর নয়। আবার তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এমনও নয়। সাধারণভাবে সাদা চোখে যে প্রশ্ন তোলা যায়, যে প্রশ্ন আসবে বলে বোঝা যায় তেমন প্রশ্নই তোলা হয়েছে। কী প্রশ্ন?
১) প্রাক্তন বিজেপি নেতা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক হতে পারে?

২) এটা আর এস এস’র চাল। যেই জিতুক সে আর এস এস’র লোকই হবে। সেই চালে বামপন্থীরা আটকে গেল! স্বভাবতই হায় সিপিএম হায় সিপিএম রব উঠেছে। আগেই বলেছি, এই রব ওঠাটা দোষের কিছু নয়, স্বাভাবিক এবং এটা সিপিআইএম – এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে। বোঝা যায় যে, তাঁরা পার্টিকে কতটা ভালোবাসেন এবং অন্য সব পার্টি থেকে আমাদের পার্টিকে কতটা আদর্শনিষ্ঠ মনে করেন।

৩) বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া নেতাকে সমর্থন করায় তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির বোঝাপড়া করে চলার বাস্তব সত্য আড়ালে চলে গেল। বিজেপি বিরোধিতায় মমতা ব্যানার্জি চ্যাম্পিয়ান হয়ে গেলেন। তাঁর চালে সিপিএম কুপোকাত হয়ে গেল।

৪) বিজেপিকে হারাতে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা সিলমোহর পেয়ে গেল।
লক্ষ করলে দেখবেন, আর এস এস লবি এই বক্তব্য সমর্থন করছে। তারা এই বোঝাপড়ায় তোল্লা দিচ্ছে।
বামপন্থী যাঁরা এই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের সমাধান সূত্র কী? এই রকম;

১) বামেরা আদর্শগত অবস্থান অটুট রাখতে আলাদা ‌প্রার্থী দিক।
২) এই ভোট বয়কট করুক।
এবার আসুন, একটু বুঝে নিতে চেষ্টা করি।

১) আচ্ছা, এই ভোটে সংখ্যার বিচারে জয় সম্পর্কে বিজেপি নিশ্চিত তো নয়ই বরং বিরোধী ভোট ভাঙাতে না পারলে বিজেপি প্রার্থীর হেরে যাওয়ার কথা। এমন অবস্থায় যারা মনে করছেন দুই প্রার্থীই আর এস এস’র লোক তাঁদের জন্য বলছি,তাহলে বিরোধী প্রার্থীকে বিজেপি সমর্থন করলেই তো আর ঝামেলা থাকে না। তাতে বরং নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তিনি বলতে পারবেন,শাসক দল হয়েও ঐক্যমতের স্বার্থে বিরোধীদের মনোনীত প্রার্থীকেই আমরাও মেনে নিচ্ছি। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে পারবেন। তাই করছেন না কেন? তুলুন না এমন আওয়াজ। উঠুক আওয়াজ যে, বিরোধীদের ভুল পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে বিরোধী প্রার্থী যখন নিজের দলেরই লোক তখন তাকে সমর্থন করে ইতিহাসে মহান হওয়ার বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে মোদী ‘ঐতিহাসিক ‘ ভুল করলেন। ‘মাস্টার স্ট্রোক ‘ দেওয়ার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হলেন মোদী।

২)যশবন্ত সিনহা ধর্মনিরপেক্ষ? উত্তর হল , বিজেপি বিরোধী সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্যান্য শক্তি তার নামে ঐক্যমত হয়েছে। তিনি ঘোষিত ফ্যাসিস্ট আর এস এস মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজি হয়েছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রথম এমনকি দ্বিতীয় পছন্দও নয় জেনেও রাজি হয়েছেন। তিনি যেমন বিজেপির নেতা, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিজেপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন আবার এটাও ঠিক নরেন্দ্র মোদীর স্বৈরাচারী , সর্বক্ষেত্রে মারমুখী ও কর্পোরেটমুখী কাজের বিরোধিতা করে বিজেপি ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে মোদী সরকারের কাজের বিরোধিতা করে চলেছেন, তার বিরোধিতার মধ্যে সংবিধান,ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘুদের রক্ষার ইস্যু লক্ষ করা গেছে। প্রার্থী হওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি বলামাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং দলীয় সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘদিন বাম আন্দোলনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি বেশ মানিয়ে গুছিয়ে মোদী পরিচালিত বিজেপি করছে , এমন উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে। তাহলে এর উল্টোটা হতে পারে না,কে বলতে পারে? এর মানে এই বলা হচ্ছে না , যে তা হবেই। দীর্ঘদিন কংগ্রেস করা শীর্ষস্থানীয় নেতা ভি পি সিংহ দুর্নীতির প্রশ্নে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমৃত্যু যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা কংগ্রেস ঘরানার তীব্র বিপরীত ছিল শুধু নয়, অনেক প্রশ্নে বামপন্থী চিন্তার আধার বেশি ছিল। তাই যশবন্ত সিনহা কত শতাংশ বিশ্বাসযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও মোদী – জমানা বিরোধী শক্তির প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়েছেন এবং সেই মর্মে লিখিত বয়ান দিয়েছেন প্রকাশ্যে।( যুক্ত করা হল) ।
এই অবস্থায় আমাদের কী করা উচিত ছিল? মোদী পরিচালিত বিজেপিকে হারাতে সমস্ত বিরোধী ঐক্যে সামিল না হয়ে বেরিয়ে আসা? তাহলেই তো পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্তের নির্দেশের বিপরীত কাজ করা হত। যা করা হল তার অর্থ কী? বিজেপি বিরোধী সম্ভাব্য বৃহত্তম শক্তিকে একজোট করতে পারা। হ্যাঁ, ফারুক আবদুল্লাহ বা গোপালকৃষ্ণ গান্ধী রাজি হলে অনেক বেশি ভালো লাগত। যদিও গোপালকৃষ্ণ গান্ধী হলেও পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া নানা অবান্তর কথা তুলে ধরত এবং বামমনস্ক অনেকেই সেগুলো উগরে দিত।

৩) তৃণমূল কংগ্রেসের আ্যডভান্টেজ ? মমতা ব্যানার্জির কৌশল মাঠে মারা গেল। বাহবা নিতে গিয়ে কারও সঙ্গে কোনরকম প্রাক আলোচনা না করেই তিনি এককভাবে দুম করে একটি সভা ডেকে শারদ পাওয়ারের নাম প্রস্তাব করে দিলেন। শারদ পাওয়ার মুখের ওপর না বলে দিলেন। পরের কোনো নামই মমতা ব্যানার্জি প্রস্তাবিত নয়। সে কারণে দ্বিতীয় সভায় তিনি নিজে না গিয়ে ভাইপোকে পাঠালেন।

৪) তাঁর বিজেপি বিরোধিতা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না?
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বোঝাপড়া কোনো একটি ইস্যুর বিষয় নয় এটা পারস্পরিক স্বার্থে ও শ্রেণিস্বার্থে। তাই একটা ঘটনায় এটা প্রতিষ্ঠিতও হয়নি, একটা ঘটনায় উবেও যাবে না। তাছাড়া পিকচার আভি বহুত বাকি হ্যায়। সিবিআই আজ পর্যন্ত ডাকাডকি ছাড়া কিছুই করেনি। বিচারপতি চরম অসন্তুষ্ট। সেটিং- এ প্রেসার গেম চলছে। বিজেপি নিজে কতটা বাড়তি ভোট জোগাড় করতে পারে দুই তরফে নজর রাখা চলছে। শেষমেষ কী হয়‌ দেখার অপেক্ষা। মোদীর কত ভোট কম পড়ে। তার ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের কতোজন ভোটের দিন ‘গুরুতর অসুস্থ ‘ হয়ে হেথা হোথা ভর্তি হন, কতজন চোরাই ক্রস ভোটিং করেন,দেখতে হবে না! তারপর তুরুপের তাস তো রয়েছেই। ‘ অমুক ‘ দল বা ‘ অমুক’ নেতার ‘ অমুক ‘ আচরণে, ‘ অমুক ‘ অবস্থানে, বিবৃতিতে… চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে আমরা এই জোট থেকে সরে আসতে বাধ্য হলাম।
আগাম অনুমান করা দুরূহ। তবে ‘ ল্যাংটার নেই বাটপারের ভয় ‘ বা ‘ দু’ কান কাটার আবার লজ্জা কী ‘ ! তাই বলছিলাম, তৃণমূল নেত্রীর মাস্টার স্ট্রোকে সিপিএম চাপে না সিপিএম-এর মাস্টার স্ট্রোকে নেত্রী মহাচাপে দেখার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

৫) আচ্ছা বলুন তো, যশবন্ত সিনহা যদি জিতে যান,বা হিসেবের অতিরিক্ত ভোট পান, দেশের মানুষের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে! নরেন্দ্র মোদী কতটা বিচলিত হবেন? কে না জানে, দলের অভ্যন্তরে মোদী – শাহ্ বিরোধী এক বিরাট শক্তি আছে যারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারার জন্য মুখিয়ে আছে। ভেতরের এই শক্তির কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নিঃসন্দেহে যশবন্ত সিনহা। সেই ভয় কী প্রবল চাপে রাখছে না মোদী- শাহ্ জুটিকে? শাসকের মধ্যে ফাটল ধরানো‌র ন্যূনতম সুযোগ, ন্যূনতম সময়ের জন্য হলেও তার ব্যবহার করার সক্ষমতা না থাকলে সে পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারে না — এই হচ্ছে চিরায়ত মার্কসবাদী শিক্ষা।

৬) বামেরা আদর্শগতভাবে আলাদা ‌প্রার্থী দিল না কেন? যেমন লক্ষ্মী সায়গলকে প্রার্থী করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রধান কাজ। আজকে বামেদের সংসদীয় শক্তি স্বাধীনোত্তর কালে সর্বনিম্ন ‌। দেশের মৌলিক কাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার অশ্বমেধের ঘোড়া টগবগিয়ে ছুটছে‌। এমন সময় সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য ত্যাগ করা কী চরম নির্বুদ্ধিতা হত না?

৭)ভোট বয়কট? এর চাইতে বিজেপি – সহায়ক কাজ আর কী হতে পারে? যখন পার্টির প্রধান কর্তব্য আর এস এস পরিচালিত বিজেপিকে বিচ্ছিন্ন করতে ও পরাস্ত করতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শক্তির সমাহার ঘটানো।

৮) ‘ নো ভোট টু বিজেপি ‘ বা বিজেপিকে হারাতে বামেদের পরিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের বক্তব্য মান্যতা পেয়ে গেল?
তৃণমূল কংগ্রেস তো পশ্চিমবঙ্গের এজেন্ডা‌ । রাষ্ট্রপতি ভোট সর্বভারতীয় বিষয়। তাই সর্বভারতীয় বিষয়ের সঙ্গে রাজ্যের ইস্যু গুলিয়ে ফেলা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এক জোটে বা ফোরামে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএম রয়েছে এমন কল্পনা কেউ করতে পারেন, কিন্তু সিপিআইএম – এর বোঝাপড়ার সঙ্গে তার মিল নেই।

৯)এটা একটা সুবিধাবাদ?
উত্তর হল, না। ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের একটি নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ। সে আলোচনা অন্য প্রসঙ্গে হতে পারে। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, এতো বহুমাত্রিক বিভিন্নতা নিয়ে এতো জাতি ,ধর্ম, ভাষা , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের দেশ আর কোথায় আছে? তার ওপরে ভারত একটি প্রজাতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার দেশ। তাই তো এতো আঞ্চলিক দল, এতো রাজ্যে আলাদা আলাদা ইস্যুতে, বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা আলাদা সরকার গঠন আর কোন দেশে আছে? তাই এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যে শুধু নয়, বিভিন্ন রাজ্যে একই দলের সঙ্গে আর একটি দলের অবস্থানের বিভিন্নতা অনিবার্য। আর এটা নতুন কিছু নয়। কংগ্রেস বা অন্য দলের সঙ্গে সিপিআইএম এর এমন বিভিন্ন অবস্থান রয়েছে শুধু তাই নয়,কেরলে এই মুহূর্তে ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি বাম গণতান্ত্রিক জোটে নেই। রয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে। সবশেষে মার্কসবাদীদের জন্য আর একটি চিরায়ত শিক্ষার কথা তুলে ধরে লেখা শেষ করব। তা এইরকম। কী করা উচিত এই নিয়ে যখন বিভ্রান্তি চরমে তখন অন্য সব চিন্তা,যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে তাকিয়ে দেখুন -- আপনি যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে চাইছেন তারা কি আপনার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়,তাহলে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি ঠিক অবস্থান নিয়েছেন। ‌ সকল বামমনস্ক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে আহ্বান, আসুন পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও গভীরতা বিবেচনা করে সকলে একজোট হই। বিজয় পাল ২৪. ০৬. ২২ বেলা: ১১.৪২.

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রাক্তন বিজেপি মন্ত্রী ও নেতা যশবন্ত সিনহা’র সম্মিলিত বিরোধী প্রার্থী মনোনীত হওয়া নিয়ে অনেক বামপন্থী বন্ধুরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের প্রশ্নগুলো মোটেই অবান্তর নয়। আবার তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এমনও নয়। সাধারণভাবে সাদা চোখে যে প্রশ্ন তোলা যায়, যে প্রশ্ন আসবে বলে বোঝা যায় তেমন প্রশ্নই তোলা হয়েছে। কী প্রশ্ন?
১) প্রাক্তন বিজেপি নেতা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক হতে পারে?

২) এটা আর এস এস’র চাল। যেই জিতুক সে আর এস এস’র লোকই হবে। সেই চালে বামপন্থীরা আটকে গেল! স্বভাবতই হায় সিপিএম হায় সিপিএম রব উঠেছে। আগেই বলেছি, এই রব ওঠাটা দোষের কিছু নয়, স্বাভাবিক এবং এটা সিপিআইএম – এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে। বোঝা যায় যে, তাঁরা পার্টিকে কতটা ভালোবাসেন এবং অন্য সব পার্টি থেকে আমাদের পার্টিকে কতটা আদর্শনিষ্ঠ মনে করেন।

৩) বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া নেতাকে সমর্থন করায় তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির বোঝাপড়া করে চলার বাস্তব সত্য আড়ালে চলে গেল। বিজেপি বিরোধিতায় মমতা ব্যানার্জি চ্যাম্পিয়ান হয়ে গেলেন। তাঁর চালে সিপিএম কুপোকাত হয়ে গেল।

৪) বিজেপিকে হারাতে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা সিলমোহর পেয়ে গেল।
লক্ষ করলে দেখবেন, আর এস এস লবি এই বক্তব্য সমর্থন করছে। তারা এই বোঝাপড়ায় তোল্লা দিচ্ছে।
বামপন্থী যাঁরা এই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁদের সমাধান সূত্র কী? এই রকম;

১) বামেরা আদর্শগত অবস্থান অটুট রাখতে আলাদা ‌প্রার্থী দিক।
২) এই ভোট বয়কট করুক।
এবার আসুন, একটু বুঝে নিতে চেষ্টা করি।

১) আচ্ছা, এই ভোটে সংখ্যার বিচারে জয় সম্পর্কে বিজেপি নিশ্চিত তো নয়ই বরং বিরোধী ভোট ভাঙাতে না পারলে বিজেপি প্রার্থীর হেরে যাওয়ার কথা। এমন অবস্থায় যারা মনে করছেন দুই প্রার্থীই আর এস এস’র লোক তাঁদের জন্য বলছি,তাহলে বিরোধী প্রার্থীকে বিজেপি সমর্থন করলেই তো আর ঝামেলা থাকে না। তাতে বরং নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। তিনি বলতে পারবেন,শাসক দল হয়েও ঐক্যমতের স্বার্থে বিরোধীদের মনোনীত প্রার্থীকেই আমরাও মেনে নিচ্ছি। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিরল দৃষ্টান্ত রাখতে পারবেন। তাই করছেন না কেন? তুলুন না এমন আওয়াজ। উঠুক আওয়াজ যে, বিরোধীদের ভুল পদক্ষেপের সুযোগ নিয়ে বিরোধী প্রার্থী যখন নিজের দলেরই লোক তখন তাকে সমর্থন করে ইতিহাসে মহান হওয়ার বিরল সুযোগ হাতছাড়া করে মোদী ‘ঐতিহাসিক ‘ ভুল করলেন। ‘মাস্টার স্ট্রোক ‘ দেওয়ার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হলেন মোদী।

২)যশবন্ত সিনহা ধর্মনিরপেক্ষ? উত্তর হল , বিজেপি বিরোধী সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্যান্য শক্তি তার নামে ঐক্যমত হয়েছে। তিনি ঘোষিত ফ্যাসিস্ট আর এস এস মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজি হয়েছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রথম এমনকি দ্বিতীয় পছন্দও নয় জেনেও রাজি হয়েছেন। তিনি যেমন বিজেপির নেতা, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বিজেপি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন আবার এটাও ঠিক নরেন্দ্র মোদীর স্বৈরাচারী , সর্বক্ষেত্রে মারমুখী ও কর্পোরেটমুখী কাজের বিরোধিতা করে বিজেপি ছেড়েছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে মোদী সরকারের কাজের বিরোধিতা করে চলেছেন, তার বিরোধিতার মধ্যে সংবিধান,ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘুদের রক্ষার ইস্যু লক্ষ করা গেছে। প্রার্থী হওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি বলামাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং দলীয় সদস্যপদ ত্যাগ করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘদিন বাম আন্দোলনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তি বেশ মানিয়ে গুছিয়ে মোদী পরিচালিত বিজেপি করছে , এমন উদাহরণ রয়েছে আমাদের সামনে। তাহলে এর উল্টোটা হতে পারে না,কে বলতে পারে? এর মানে এই বলা হচ্ছে না , যে তা হবেই। দীর্ঘদিন কংগ্রেস করা শীর্ষস্থানীয় নেতা ভি পি সিংহ দুর্নীতির প্রশ্নে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসে আমৃত্যু যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা কংগ্রেস ঘরানার তীব্র বিপরীত ছিল শুধু নয়, অনেক প্রশ্নে বামপন্থী চিন্তার আধার বেশি ছিল। তাই যশবন্ত সিনহা কত শতাংশ বিশ্বাসযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও মোদী – জমানা বিরোধী শক্তির প্রস্তাবে তিনি রাজি হয়েছেন এবং সেই মর্মে লিখিত বয়ান দিয়েছেন প্রকাশ্যে।( যুক্ত করা হল) ।
এই অবস্থায় আমাদের কী করা উচিত ছিল? মোদী পরিচালিত বিজেপিকে হারাতে সমস্ত বিরোধী ঐক্যে সামিল না হয়ে বেরিয়ে আসা? তাহলেই তো পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সিদ্ধান্তের নির্দেশের বিপরীত কাজ করা হত। যা করা হল তার অর্থ কী? বিজেপি বিরোধী সম্ভাব্য বৃহত্তম শক্তিকে একজোট করতে পারা। হ্যাঁ, ফারুক আবদুল্লাহ বা গোপালকৃষ্ণ গান্ধী রাজি হলে অনেক বেশি ভালো লাগত। যদিও গোপালকৃষ্ণ গান্ধী হলেও পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া নানা অবান্তর কথা তুলে ধরত এবং বামমনস্ক অনেকেই সেগুলো উগরে দিত।

৩) তৃণমূল কংগ্রেসের আ্যডভান্টেজ ? মমতা ব্যানার্জির কৌশল মাঠে মারা গেল। বাহবা নিতে গিয়ে কারও সঙ্গে কোনরকম প্রাক আলোচনা না করেই তিনি এককভাবে দুম করে একটি সভা ডেকে শারদ পাওয়ারের নাম প্রস্তাব করে দিলেন। শারদ পাওয়ার মুখের ওপর না বলে দিলেন। পরের কোনো নামই মমতা ব্যানার্জি প্রস্তাবিত নয়। সে কারণে দ্বিতীয় সভায় তিনি নিজে না গিয়ে ভাইপোকে পাঠালেন।

৪) তাঁর বিজেপি বিরোধিতা নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না?
তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি বোঝাপড়া কোনো একটি ইস্যুর বিষয় নয় এটা পারস্পরিক স্বার্থে ও শ্রেণিস্বার্থে। তাই একটা ঘটনায় এটা প্রতিষ্ঠিতও হয়নি, একটা ঘটনায় উবেও যাবে না। তাছাড়া পিকচার আভি বহুত বাকি হ্যায়। সিবিআই আজ পর্যন্ত ডাকাডকি ছাড়া কিছুই করেনি। বিচারপতি চরম অসন্তুষ্ট। সেটিং- এ প্রেসার গেম চলছে। বিজেপি নিজে কতটা বাড়তি ভোট জোগাড় করতে পারে দুই তরফে নজর রাখা চলছে। শেষমেষ কী হয়‌ দেখার অপেক্ষা। মোদীর কত ভোট কম পড়ে। তার ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের কতোজন ভোটের দিন ‘গুরুতর অসুস্থ ‘ হয়ে হেথা হোথা ভর্তি হন, কতজন চোরাই ক্রস ভোটিং করেন,দেখতে হবে না! তারপর তুরুপের তাস তো রয়েছেই। ‘ অমুক ‘ দল বা ‘ অমুক’ নেতার ‘ অমুক ‘ আচরণে, ‘ অমুক ‘ অবস্থানে, বিবৃতিতে… চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে আমরা এই জোট থেকে সরে আসতে বাধ্য হলাম।
আগাম অনুমান করা দুরূহ। তবে ‘ ল্যাংটার নেই বাটপারের ভয় ‘ বা ‘ দু’ কান কাটার আবার লজ্জা কী ‘ ! তাই বলছিলাম, তৃণমূল নেত্রীর মাস্টার স্ট্রোকে সিপিএম চাপে না সিপিএম-এর মাস্টার স্ট্রোকে নেত্রী মহাচাপে দেখার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।

৫) আচ্ছা বলুন তো, যশবন্ত সিনহা যদি জিতে যান,বা হিসেবের অতিরিক্ত ভোট পান, দেশের মানুষের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে! নরেন্দ্র মোদী কতটা বিচলিত হবেন? কে না জানে, দলের অভ্যন্তরে মোদী – শাহ্ বিরোধী এক বিরাট শক্তি আছে যারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারার জন্য মুখিয়ে আছে। ভেতরের এই শক্তির কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নিঃসন্দেহে যশবন্ত সিনহা। সেই ভয় কী প্রবল চাপে রাখছে না মোদী- শাহ্ জুটিকে? শাসকের মধ্যে ফাটল ধরানো‌র ন্যূনতম সুযোগ, ন্যূনতম সময়ের জন্য হলেও তার ব্যবহার করার সক্ষমতা না থাকলে সে পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারে না — এই হচ্ছে চিরায়ত মার্কসবাদী শিক্ষা।

৬) বামেরা আদর্শগতভাবে আলাদা ‌প্রার্থী দিল না কেন? যেমন লক্ষ্মী সায়গলকে প্রার্থী করা হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রধান কাজ। আজকে বামেদের সংসদীয় শক্তি স্বাধীনোত্তর কালে সর্বনিম্ন ‌। দেশের মৌলিক কাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার অশ্বমেধের ঘোড়া টগবগিয়ে ছুটছে‌। এমন সময় সম্মিলিত বিরোধী ঐক্য ত্যাগ করা কী চরম নির্বুদ্ধিতা হত না?

৭)ভোট বয়কট? এর চাইতে বিজেপি – সহায়ক কাজ আর কী হতে পারে? যখন পার্টির প্রধান কর্তব্য আর এস এস পরিচালিত বিজেপিকে বিচ্ছিন্ন করতে ও পরাস্ত করতে সর্বোচ্চ সংখ্যক শক্তির সমাহার ঘটানো।

৮) ‘ নো ভোট টু বিজেপি ‘ বা বিজেপিকে হারাতে বামেদের পরিবর্তে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনের বক্তব্য মান্যতা পেয়ে গেল?
তৃণমূল কংগ্রেস তো পশ্চিমবঙ্গের এজেন্ডা‌ । রাষ্ট্রপতি ভোট সর্বভারতীয় বিষয়। তাই সর্বভারতীয় বিষয়ের সঙ্গে রাজ্যের ইস্যু গুলিয়ে ফেলা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় না। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এক জোটে বা ফোরামে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিআইএম রয়েছে এমন কল্পনা কেউ করতে পারেন, কিন্তু সিপিআইএম – এর বোঝাপড়ার সঙ্গে তার মিল নেই।

৯)এটা একটা সুবিধাবাদ?
উত্তর হল, না। ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের একটি নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ। সে আলোচনা অন্য প্রসঙ্গে হতে পারে। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে, এতো বহুমাত্রিক বিভিন্নতা নিয়ে এতো জাতি ,ধর্ম, ভাষা , সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের দেশ আর কোথায় আছে? তার ওপরে ভারত একটি প্রজাতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার দেশ। তাই তো এতো আঞ্চলিক দল, এতো রাজ্যে আলাদা আলাদা ইস্যুতে, বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলাদা আলাদা সরকার গঠন আর কোন দেশে আছে? তাই এখানে কেন্দ্র ও রাজ্যে শুধু নয়, বিভিন্ন রাজ্যে একই দলের সঙ্গে আর একটি দলের অবস্থানের বিভিন্নতা অনিবার্য। আর এটা নতুন কিছু নয়। কংগ্রেস বা অন্য দলের সঙ্গে সিপিআইএম এর এমন বিভিন্ন অবস্থান রয়েছে শুধু তাই নয়,কেরলে এই মুহূর্তে ফরোয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি বাম গণতান্ত্রিক জোটে নেই। রয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে।

সবশেষে মার্কসবাদীদের জন্য আর একটি চিরায়ত শিক্ষার কথা তুলে ধরে লেখা শেষ করব। তা এইরকম। কী করা উচিত এই নিয়ে যখন বিভ্রান্তি চরমে তখন অন্য সব চিন্তা,যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে তাকিয়ে দেখুন — আপনি যে শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে চাইছেন তারা কি আপনার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়,তাহলে নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি ঠিক অবস্থান নিয়েছেন।
‌ সকল বামমনস্ক ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে আহ্বান, আসুন পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও গভীরতা বিবেচনা করে সকলে একজোট হই।
বিজয় পাল
২৪. ০৬. ২২
বেলা: ১১.৪২.

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!