অসহিষ্ণু ও হিংস্র ভারত

  শান্তনু দত্ত চৌধুরী


 বিজেপি দলের জাতীয় মুখপাত্র নুপুর শর্মা কিছুদিন আগে ( ২৭ মে ) ‘ টাইমস নাউ ‘ নামক ইংরেজি মাধ্যমের জাতীয় টিভি চ্যানেলের বিতর্কে অংশগ্রহণ করে বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অত্যন্ত নিম্নরুচিসম্পন্ন কুরুচিকর মন্তব্য করেন। ওই চ্যানেলে ওই অনুষ্ঠানটি ওই সময়ে পরিচালনা করছিলেন শ্রীমতী নোবিকা কুমার।তিনি এওই সময় নুপুর শর্মাকে নিবৃত্ত করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেন নি। যে সমস্ত চ্যানেল মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে সংখ্যালঘু বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের মানুষদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রচার করে চলেছে এই চ্যানেলটি তার মধ্যে অন্যতম। ইতিমধ্যেই এডিটর্স গিল্ড এই ধরণের মিডিয়াগুলির দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকার নিন্দা করে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে নুপুর শর্মা বিজেপির একজন অন্যতম জাতীয় মুখপাত্র। তার ওই কুৎসিত বক্তব্য তার দলের দিল্লি প্রদেশ কমিটির মিডিয়া ইন চার্জ নবীন জিন্দাল ট্যুইট করে সমর্থন করেন।এদের সেই সব কুরুচিপূর্ণ ও বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে ঐ দলের সর্ব ভারতীয় নেতৃত্ব বা দিল্লি পুলিশ , যা ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে, তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।     
  ইতিমধ্যে জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়।নুপুর শর্মার করা মন্তব্যগুলি প্রসঙ্গে এক সপ্তাহ কেটে গেলেও বিজেপি কোনও নিন্দা করেনি, দোষ বা ভুল স্বীকার তো দূরের কথা। এর ফলে এই মতই প্রতিষ্ঠা পায় যে নুপুর শর্মা বিশ্বনবী সম্পর্কে যে সব অনভিপ্রেত মন্তব্যগুলি করেছেন, তা আসলে বিজেপি তথা সঙ্ঘর সর্বাঙ্গীণ ও সামগ্রিক মনোভাবেরই পরিচায়ক।নুপুর নিজেও দাবি করেছিল যে তার প্রতি তার দলের  সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সমর্থন রয়েছে । নুপুর শর্মার করা মন্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে দেশে এবং আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে বিদেশেও। স্বাভাবিকভাবেই তা নিয়ে দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, বিশেষ করে  উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে। এরই মধ্যে কয়েকটি দেশ ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের তাদের বিদেশ দপ্তরে ডেকে পাঠিয়ে তাদের দেশের সরকার এবং জনগণের পক্ষ থেকে এই ধরণের বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায়। বিজেপি বা মোদি সরকার এতো কিছু সত্ত্বেও চুপচাপ ছিলো, কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি ভারত। কিন্তু অবস্থা আরও ঘোরালো হয়ে উঠলো যখন সেই সব দেশে ভারত  বিরোধী তীব্র প্রচার শুরু হল। এমনকি, সেই সব দেশে ভারতীয় পণ‍্য সামগ্রী বয়কটের ডাক  দেওয়া হল। এই সব দেশে ভারতীয় পণ্যের খুব ভালো বাজার আছে। এই খবরও আসতে থাকে যে এই সব দেশগুলির বিভিন্ন বিপনি সংস্থা থেকে ভারতীয় পণ্যসামগ্রী সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। এর পরেই মোদি সরকার বুঝতে পারে বিপদ আসছে এবং দেশের  অর্থনীতির ওপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
  স্বাধীনতার পর আমাদের দেশ সংসদীয় গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তিরূপে গ্রহণ করে। পন্ডিত নেহরু দৃঢ়তার সঙ্গে এই নীতি অনুসরণ করেন।এই জন্য ভারত  এই উপসাগরীয় ও মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলিতে এক বিশেষ সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। গত আট বছর ধরে মোদির নেতৃত্বে পরিচালিত বিজেপি সরকার দেশের অভ্যন্তরে কিরকম  অগণতান্ত্রিক ও সংখ্যালঘুবিরোধী নীতি নিয়ে চলছে সে বিষয়ে ওই দেশগুলি সম্যকভাবে অবহিত।কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এতদিন ওই দেশগুলি কিছু বলেনি। ২০২০ সালের মার্চ মাসে দিল্লিতে সরকারের অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠিত তবলীগ জামাত -এর বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে বিজেপি দল ও সরকার প্রচার চালিয়েছিল যে মুসলমানরা চক্রান্ত করে দেশে করোনা ছড়িয়েছে।বিদেশ থেকে আগত অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। অবশেষে প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মুম্বাই হাইকোর্ট তাঁদের রায়ে পরিষ্কার করে সেকথা বলেছে।গোমাংস রাখার অভিযোগে মব লিনচিং , নাগরিকত্ব সংশোধন আইন C.A.A পাস করে সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব হরণ , পোশাক নিয়ে  আক্রমণ , কর্ণাটক মেয়েদের মাথায় হিজাব দেওয়া নিষিদ্ধ করা , রামনবমি ও হনুমান জয়ন্তীর মিছিল থেকে মসজিদের সামনে ডি.জে বাজিয়ে নর্তন কুর্দন ও হামলাবাজি প্রভৃতি ঘটনা লাগাতরভাবে চলছিল। ভারতবর্ষকে মোদি , শাহ , যোগীরা এক ধর্মান্ধ হিংস্র রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন।  কিন্তু সবকিছুর একটা সীমা আছে।এইবার নুপুর শর্মার বিশ্বনবী সম্পর্কে কুৎসিত  মন্তব্য আর উপরোক্ত দেশগুলি সহ্য করতে পারেনি। তাই তারা সঠিক কারণেই প্রতিবাদ করেছে।  সঙ্ঘ পরিবারের হিন্দুত্বের সঙ্গে প্রকৃত হিন্দু ধর্মের কোনই সম্পর্ক নেই। নুপুর শর্মা , নবীন জিন্দালরা যেসব কথাবার্তা বলে নিন্দিত হচ্ছে , এই সব কথা তারা কোথা থেকে ও কাদের কাছ থেকে শিখেছে ? আমরা তো হরবখত মোদি ,যোগী , অমিত শাহদের মুখে শ্মশান ও কবরস্থান , লাভ জিহাদ , ঈদ - রমজানে বিজলি তো দিওয়ালিতেও বিজলি , শতকরা ৮০ ভাগের সঙ্গে শতকরা ২০ ভাগের লড়াই -- এই জাতীয় কথাবার্তা শুনে এসেছি। এখন কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাস ' বিশ্বগুরু ' র সরকার জোর হাত করে বলছে নুপুর শর্মা আর নবীন জিন্দাল প্রান্তিক ব্যক্তি ( Fringe Element ) , ওদের খুব শাস্তি দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি। এমনকি ওই সব উপসাগরীয় ও মধ্য প্রাচ্য অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক যাতে বজায় থাকে ও ক্ষতিগ্রস্থ না হয় তার জন্য কী না বলেছে। 

ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রক ওই দেশগুলিকে জানিয়েছে :- ১) বিজেপি সব ধর্মকে শ্রদ্ধা করে ২) বিজেপি কঠোর ভাবে যে কোনও ধর্মের যে কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে  অপমানজনক আচরণ প্রত্যাখ্যান করে ৩)বিজেপি যে কোনও মতাদর্শ যা অন্য যে কোনও সম্প্রদায় ও ধর্মকে অপমান করে তার বিরূদ্ধে ৪) ভারতীয় সংবিধান  দেশের প্রতিটি নাগরিককে তার পছন্দ অনুযায়ী যে কোনও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং প্রতিটি ধর্মকে মর্যাদা ও শ্রদ্ধা করার অধিকার দিয়েছে।রাষ্ট্র সম্পর্কিত উপরোক্ত সাংঘাতিক  গোপন তথ্যগুলি কে জানিয়েছেন ? প্রধানমন্ত্রী মোদি ? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত  শাহ ? না এরা কেউ নয়। ওই তথ্য জানিয়েছেন বিজেপি দলের  জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অরুণ সিংহ নামক এক অখ্যাত ব্যক্তি। হাস্যকর।যারা সর্বদা ঘৃণার চাষ করে তাদের মুখে আজ একি কথা ! আর এই দলীয় নেতার চিঠি বিভিন্ন দেশের বিদেশ মন্ত্রককে পৌছে দিয়েছে ভারত সরকারের বিদেশ মন্ত্রক। দল ও সরকারের পার্থক্য  ধুয়ে মুছে গিয়েছে। হাস্যকর।
এতো কিছু ঘটার পর, বিজেপি চক্ষু লজ্জার খাতিরে নুপুর শর্মাকে  সাসপেন্ড করেছে মাত্র।নবীন জিন্দাল দল থেকে বহিস্ক্রীত হয়েছে।আর অতি সম্প্রতি  তাদের নামে দিল্লি পুলিশ এফ.আই.আর করেছে। কিন্তু তাতে অভিযোগ কী তা লেখা নেই। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই জনমানসে প্রশ্ন উঠছে এমন গর্হিত কাজ করা সত্বেও নূপুর শর্মার মতো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেন কোনো প্রকারের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলোনা, এতো দিন পরেও। এখনো পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নীরব। 
এদিকে ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্ৰচার সমানে চলছে। নূপুরদের বিরুদ্ধে কোনও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ উত্তর প্রদেশ  ও হিন্দি বলয়ের বিজেপি শাসিত রাজ্যে সম্ভব নয়। বুলডোজার চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বশংবদ মিডিয়া তাদের বিদ্বেষ প্রচার সমানে চালিয়ে যাচ্ছে।উত্তরপ্রদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীদের বাড়ি পুলিশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টের  বহু প্রাক্তন বিচারপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি শ্রী রমণাকে চিঠি দিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের এই অমানবিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, প্রশাসনের এমন নির্মম পদক্ষেপ সংবিধান এবং মৌলিক অধিকারের বিষয়টিকে পরিহাসের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এই আইনজ্ঞদের বক্তব্য এমন কঠিন পরিস্থিতিতেই বিচার বিভাগের ক্ষমতা পরীক্ষিত হয়।

  এখন প্রশ্ন উঠেছে এই দেশ কি ক্রমশ আফ্রিকার সেই ‘ রোয়ান্ডা ‘ নামে  দেশটার পথে চলেছে ? ‘রেডিও রোয়ান্ডা’ র মাধ্যমে ১৯৯৩-৯৪ সালে তীব্র বিদ্বেষ প্রচার করে ওই বছর ‘হুতু’ এথনিক গ্রূপের সরকার ১ লাখ ‘তুৎসী ‘ উপজাতির মানুষকে হত্যা করেছিল। ১৯৩০/১৯৪০ এর নাৎসি জার্মানির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে ? হিটলারের ইহুদি নিধন।কে না জানে হিটলার কাদের উপাস্য দেবতা ছিল।

      

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!