খড়্গপুর আইআইটির ক্যালেণ্ডার ও জাতীয় ইতিহাসের খিচুড়ি

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

নতুন বছরের খড়্গপুর আইআইটির ক্যালেণ্ডার ভালো করে দেখলাম।

ঠিক বুঝতে পারলাম না, কোন অধীত বিদ্যাচর্চার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই ক্যালেণ্ডার রচিত হয়েছে। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ইত্যাদি ছাড়াও আজ জিনবিদ্যা, প্রত্নজিনবিদ্যা বা প্যালিও জেনেটিক্স, প্রত্ন-উদ্ভিদবিদ্যা বা প্যালিওবটানি ইত্যাদির সাহায্যে প্রাচীন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। আজকে ইতিহাসবিদরাও ওই সময়ের ইতিহাস লিখতে জিনবিদদের সাহায্য নেন। আর এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই মানব সভ্যতা এগিয়েছে।

মনে করেছিলাম, একথা বলাই বাহুল্য যে, বিদ্যাচর্চাকে এক সীমাবদ্ধ অঞ্চলে, এক নির্দিষ্ট ভাবনায় বন্দি করা যায় না। তাহলে তার পরিণতি হবে চাকাবিহীন আমেরিকার সভ্যতার মত। এত সুপ্রাচীন ও উন্নত মায়া সভ্যতা বাকি মানব সভ্যতার একত্রিত জ্ঞানের সঙ্গে (এবং ইউরোপীয়দের দখলদারির সঙ্গেও বটে) পাল্লা দিতে পারল না। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পিরামিড গড়লেও, ওরা কলম্বাসের আগে চাকার ব্যবহার তেমনভাবে করেনি। অপরদিকে ইউরোপ-মধ্য এশিয়া-মিশর-ভারত-চীন, এসব জায়গায় খণ্ড খণ্ড সভ্যতাগুলো একে অপরের পরিপূরক হয়েছিল। পরিযান, বাণিজ্য ইত্যাদির মাধ্যমে এরা একে অন্যকে পুষ্টি জুগিয়েছিল।

খড়্গপুর আইআইটির ক্যালেণ্ডার দেখে মনে হল ওনারা প্রমাণ করতে চান ভারতবর্ষে কোন ইন্দো-ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী কখনও আসেনি, হরপ্পীয় ও বৈদিক সভ্যতা অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়েছে। আমাদের সভ্যতায় পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের কোন অবদান নেই।

আমরা হলাম আমরা, ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রাহ্মণ্যধর্ম অনুসারীরা।

জ্ঞানচর্চায় কোন প্রতিপাদ্য থাকলে তা প্রমাণ করতে সমস্ত ধরণের জ্ঞানধারার সাহায্য নিয়ে সামগ্রিকভাবে সেই হাইপোথেসিসকে প্রমাণ করতে হয়; ক্যালেণ্ডারে কোন সাম্প্রতিক বিজ্ঞানবিষয়ক বা ইতিহাসচর্চার উল্লেখ পেলাম না।

শুধু তাই নয়। সত্যি কথা বলতে, ক্যালেণ্ডার যারা রচনা করেছেন তারা শেষ পর্যন্ত তাদের বক্তব্যটাও কি ঠিক করে বলতে পেরেছেন? ভারতমাতার সঙ্গে হরপ্পীয় কিশোরীর মূর্তি, কসমিক লাইট, একত্রিত একশৃঙ্গ ও ইউনিকর্ন, বুদ্ধের ছবির সঙ্গে হরপ্পীয় সিল – আমি দিশেহারা। সুকুমার রায় অবশ্য অনেকদিন আগেই লিখেছেন:

সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি ?
কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি ?

শুধু একটা কথা বলি। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ওঙ্গে বা অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে অবিমিশ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে থেকেছে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সেই আদি অধিবাসীরা সভ্যতার আদিম স্তরে রয়ে গেল। আর এদিকে বাকি পৃথিবীর মানুষ মহাকাশে পাড়ি দিল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের ছবি তুলে মুহূর্তে তা পাঠিয়ে দেয় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে এবং গড় জীবনকাল বাড়িয়ে নিল ৭৯ বছরে।

‘বিশুদ্ধ জাতি’ হওয়া অবিমিশ্র সৌভাগ্য কিনা, সেটাও একবার ভাবতে পারি।

সৌজন্য: Madhusree Bandyopadhyay লিখিত এই লেখাটি বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ শান্তনু পোস্ট করেছেন। দেশকাল ভাবনা গ্রুপ থেকে সংগৃহীত

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!