অতিমারীকে বিদায় দেবে ওমিক্রন


চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

করোনার প্রকোপ ফের বাড়ছে। এই সংবাদ লেখার সময়ে দেশে নতুন করোনা রোগীর সংখ্যা ৩৭,৩৭৯ জন, আর ওমিক্রন আক্রান্তের সংখ্যা ১,৮৯২ জন।ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ভীষণই সংক্রামক, দ্রুত ছড়ায়। করোনার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভ‌্যারিয়েন্ট ‘ডেল্টা’-র তুলনায় ওমিক্রন ৩ গুণ দ্রুত ছড়ায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শাপে বর হতে চলেছে ওমিক্রন। যে সঠিক প্রতিষেধকের জন্য বিশ্বের বিজ্ঞানী গবেষকরা হন্যে হয়ে দিনরাত এক করে দিচ্ছেন, সেই প্রতিষেধক প্রকৃতি নিজেই পাঠিয়েছে ওমিক্রন নামে। যারা ওমিক্রন আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের শরীরে তৈরি হয়ে যাচ্ছে রোগ প্রতিরোধের প্রাকৃতিক ক্ষমতা। ন্যাচারাল ইমিউনিটি। সেটাই হবে রক্ষাকবচ। মৃত্যুঘণ্টা বাজাবে কোভিড মহামারীর।

ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট মাসখানেক আগে পাওয়া যায় দক্ষিণ আফ্রিকায়। মাত্র এক মাসের মধ্যে, ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত, বিশ্বের ৩,৭৩,১০৬ জন নিশ্চিতভাবেই ওমিক্রন আক্রান্ত হয়েছেন। আরও ৬,২৮,৭৩৯ জন আক্রান্ত বলে অনুমান। অকল্পনীয় দ্রুততায় রোগ ছড়াচ্ছে! তবে আশার কথা, এর উপসর্গ খুবই মৃদু‌। আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে না। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে না, অক্সিজেন লাগছে না। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমিক্রনের ফুরিন ক্লিভেজের দু’টি ও স্পাইক প্রোটিনের ৩২টি-সহ মোট ৫২টি মিউটেশন হয়েছে। ফলে দেলতার চেয়েও ৩ গুন দ্রুততায় ছড়াচ্ছেও। কিন্তু, এর ফলে রোগীকে কাবু করার ক্ষমতা কমে গেছে। ওমিক্রন আক্রান্তরা দ্রুত সেরে উঠে করোনার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ইমিউনিটি পেয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞানীদের পরামর্শ, আতঙ্কিত হবেন না। যে যে উপসর্গের জন্য করোনা প্রাণঘাতী, সেগুলি কোনওটাই ওমিক্রনের নেই। উল্টে তৈরি করে দিচ্ছে গণ রক্ষাকবচ — হার্ড ইমিউনিটি। ফলে, আর দু থেকে তিন মাসের মধ্যেই ওমিক্রন প্রাকৃতিক উপায়ে বিশ্বের করোনা রক্ষাকবচ হয়ে যাবে। একে প্রকৃতির আশীর্বাদ ভাবাই ভাল। এই রাজ্যের সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ যোগীরাজ রায় বলেছেন, ওমিক্রন নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। টিকা নেওয়ার পর করোনা আক্রান্ত হলে কিংবা করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর টিকা নিলে যে বাড়তি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, সেটাই দেবে ওমিক্রন। বহু মানুষের মৃত্যু রোধ করা যাবে।

ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট মনিকা গান্ধী বলেছেন, “আমরা এক নতুন অধ্যায়ে এসেছি। ভাইরাস চিরকালই ছিল, থাকবে। কিন্তু, এই ভাইরাস যে পরিমাণ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে দিচ্ছে, আমার ধারণা, এটাই অতিমারীকেও শেষ করে দেবে।” উৎপত্তির দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় ওমিক্রনে হাসপাতালে ভর্তির হার ৭৩ শতাংশ কমেছে। ইজরায়েলের গবেষক ডাক্তার আফসাইন ইমরানি বলেছেন, ওমিক্রন এমন একটি প্রাকৃতিক টিকা, যা হাজার চেষ্টা করেও ওষুধ কোম্পানিগুলি বানাতে পারেনি।

বিশ্বের পাচঁটি আলাদা আলাদা দেশে গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্পাইক প্রোটিনে বহুবার মিউটেশন হওয়ায় চিন্তা ছিল। দেখা যাছে, অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলির মতো এটি ফুসফুসে ছড়াতে পারছে না, বড় জোর শ্বাসনালীর উপরিভাগে সামান্য প্রভাব ফেলছে, কাশি হচ্ছে। জাপান ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের একটি বড় দল খরগোশ ও ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখেছেন, ফুসফুসে ওমিক্রণের প্রভাব খুবই কম। বেলজিয়ামের বিজ্ঞানীরা গবেষণার জন্য বেছেছিলেন সিরিয়ান খরগোশ। আগের ভ্যারিয়েন্টের সামনে সিরিয়ান খরগোশ খুবই কাতর ছিল। এবার সেখানেও আশার বার্তা পেয়েছেন। হংকং-এর গবেষকরা বিভিন্ন সময়ে ফুসফুসের অপারেশনের সময় রোগীদের থেকে সংগৃহীত টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা করে বলছেন, অন্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ওমিক্রনের প্রভাব খুবই ধীরে ও প্রায় নগণ্য।

কেপ টাউন ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজিস্ট ওয়েন্ডি বার্গার বলেছেন, কোভিড ১৯ ভাইরাসের শরীরবৃত্তীয় বদল ঘটে গেছে। আগে মানুষের কোষে বাসা বাঁধতে দুটি আলাদা পথ নিচ্ছিল। এখন স্পাইক প্রোটিনে পরিবর্তন হওয়ায় একটি পথই নিচ্ছে। ফলে, শ্বাসনালীর উর্ধাংশেই প্রভাব ফেলছে, ফুসুফুসে পৌঁছচ্ছে না। অতি সংক্রামক বলে অ্যান্টিবডির প্রতিরোধ যেমন এড়াতে পারছে, তেমনই টিকা নেওয়া বা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে গড়ে ওঠা দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধ ক্ষমতা এড়াতে পারছে না। ওয়েন্ডি বার্গার ও তার সঙ্গীরা টি-সেল ও বি-সেল নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার পর এই দাবি করেছেন।

অমিক্রন কি তাহলে সত্যিই থামাকে অতিমারী? আমেরিকার কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অতিমারী বিশেষজ্ঞ মেডিকেল অফিসার জেসিকা জাস্টম্যান বলেছেন, “যখন দেখবেন, সমস্ত তথ্যই অন্যরকম এবং সবগুলি একটি নির্দিষ্ট দিশায় যাচ্ছে, তখন নিজেই বিশ্বাস করবেন যে, ব্যাপারটা ঘটতে চলেছে।” ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মনিকা গান্ধী আশাবাদী, “ওমিক্রন আক্রান্তের সংখ্যা যখন রেকর্ড করবে, তখনই অতিমারী শেষের ইঙ্গিতটাও দিয়ে যাবে।” হংকং এর আরেকটি গবেষণার সূত্র ধরে মনিকা জানান, ভ্যাক্সিন নেওয়া যারা ওমিক্রন আক্রান্ত হয়েছেন, করোনার অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলি তাঁদের ছুঁতেও পারছে না। এটাই আশার কথা। “সম্ভবত এটাই করোনা অতিমারির বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দেবে।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!