জন্মদাত্রী‌

নববর্ষের হুল্লোড়ে সব চাইতে উপেক্ষিত থাকেন আমাদের সমাজে আজকাল ঘরের বয়স্করা, এমনকি মায়েরাই, এটা এমন এক সামাজিক ট্রেন্ড যা তুলে ধরে অন্তঃসার শূন্যতা, লিখছেন কাবেরী চক্রবর্তী


প্রথমেই বলি আমার এই লেখাটি গল্প না বলে প্রতিবেদন বলা মনে হয় শ্রেয়। আর আমার এই লেখার কিছু রসদ কিছুটা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত আর বাকিটা বর্তমান সমাজ থেকে নেওয়া আত্মোপলব্ধি, যে উপলব্ধি আমার-আপনার কম বেশি অনেকেরই আছে। আজ মনে হল এই বিষয় নিয়ে কিছু লেখা উচিত।
আসলে যে হাতগুলি একদিন চলতে শিখিয়ে ছিল, সেই হাতগুলি আজ কেমন অশক্ত হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে অসুস্থ মা কে ডাক্তারের নিষেধ সত্বেও বাবা ভালবেসে মিষ্টি খাইয়েছিল বলে ছেলে বাবাকে সপাটে চড় মেরেছিল। এ খবর সোশ্যাল মিডিয়া’তে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। যে সমাজের মরালিটি ‘পিতা হি পরমন্তপঃ’ বা ‘মাতা স্বর্গাদপী গরিয়সী!’- সেই সমাজে বাবা-মা আজ নগন্য প্রাণী, এটা ভাবতে কষ্ট হয়। তবে এ ঘটনা কিন্তু খুব নতুন নয়।
এক
সবিতা দেবীর ব্যবসায়ী স্বামী মৃত্যুর আগে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি স্ত্রী’র নামে লিখে দিয়ে যান, উত্তর কলকাতায় বাড়ি, সঙ্গে বেশ কিছু টাকা। আর আছে তার একমাত্র পুত্র, পুত্রবধু এবং নয়নের মণি নাতি অজেয়। পুত্র কর্মসূত্রে দিল্লি নিবাসী। মা একাই থাকেন। মাঝে মাঝে পুত্র পুত্রবধু আসে। আসলে দিল্লির ছোট ফ্ল্যাটে মায়ের জায়গা হয়নি। যখনি ছেলে আসে, দোতলা বাড়ির একতলাটা ভাড়া দেবার কথা বলে, কিন্তু মা রাজি হয় না। কারণ মা একতলাতে পথশিশুদের নিয়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করেছেন। ছেলের কাছে মায়ের এই কাজ হল বিলাসিতা। ছেলে-বৌমা অনেকবারই এটা তুলে দিতে বলেছে। এই নিয়ে অশান্তির জেরে ছেলে প্রায় আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। সবিতা দেবী কিন্তু কর্তব্যবোধে কোন ত্রুটি রাখেন না। জন্মদিন, পুজো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনজনের জামাকাপড় পাঠানো, টাকা পাঠানো সবই করেন। প্রত্যেকবার নাতি নতুন ক্লাসে উঠলে তার সব খরচ নিয়মিত উনি পাঠিয়ে থাকেন।তারপর ছেলের নামে বিভিন্ন বীমা, সব উনি চালিয়ে যান। ছেলে বারবারই মা কে বলেন, কোলকাতার এই বাড়িতে তার কোন প্রয়োজন নেই। সবিতা দেবী সব বুঝেও নীরব থাকেন আর শুধু নাতিকে একবার দেখবার জন্য মনটা ব্যকুল হয়ে উঠে! এর মধ্যে হঠাৎ ছেলে একদিন ফোন করে মায়ের কাছে মায়ের আই কার্ড, প্যান কার্ড চেয়ে পাঠান তার অফিসে লাগবে বলে। মা ভাবেন এত বছর লাগলো না তবে এখন কেন লাগবে। তিনি বুঝতে পারেন ছেলে বৌমা তাকে অন্যত্র পাঠাবার ব্যবস্থা করছে। মা ভাবেন, আমি তিল তিল করে ছেলেকে বড় করেছি অথচ কোনদিন কিছু চাইনি! অথচ আজ তার এই প্রতিদান। সব বুঝেও তিনি সব কাগজ পাঠিয়ে দেন।
কিছুদিন পর ই তিনি দেখেন প্রমোটারের আনাগোনা।সবিতা দেবী সব বুঝে নিজেই খোঁজখবর নিয়ে ‘শেষের কবিতা’য় চলে যান।
দুই
মাধবী, মাধবী, একটু আয় না, বাথরুমে যাব; মাধবী ব্যস্ত টিভিতে। তার সময় নেই! ডাকসাইটে স্কুলের বড়দি সুনন্দা’দি অশক্ত শরীর’টিকে টানতে টানতে বাথরুমে নিয়ে গেল। আর এই সময়ে বাথরুম থেকে ধুম আওয়াজ। মাধবী ছুটে আসে। মাধবীর সঙ্গে বৌমা চিৎকার করে ওঠে, ‘পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর বাথরুম পায় কেন আপনার। এভাবে আর পারা যাচ্ছে না।’- অথচ তার পেনশনের টাকাতেই আয়া মাধবী আছে। কিন্তু বৌমার ফাই ফরমাস খাটাতেই সে ব্যস্ত।
টেনে তোলা হয় সুনন্দা’দি কে, হাতে রক্ত জমে যায়। রাতে ছেলে এসে মা’কে বলে, একটু কম খাওয়া দাওয়া করো, তবে বাথরুমে কম যেতে হবে, কষ্ট কম পাবে! না হলে আয়াও পাওয়া যাবে না। পরের দিন থেকে তাই হল।তার ইচ্ছে তার অর্থ সব মূল্যহীন হয়ে গেলো।
তিন
সেই কোন দুপুর থেকে মঞ্জুদেবী স্টেশনে গুটিসুটি মেরে বসে আছে কেউ খেয়ালও করছে না। ছেলে বসিয়ে দিয়ে গেছে। বলে গেছে খাবার আনতে যাচ্ছে। ছেলে মা’কে নিয়ে তীর্থভ্রমণে বেড়িয়েছে। কিন্তু ছেলে তো আসছে না। চিন্তায় মা খালি ভগবানকে ডাকছে আর ভাবছে ছেলের কোন বিপদ হলো না তো। মাথায় হাত ঠেকাচ্ছেন আর বলছেন, ‘হে ভবতারিণী, আমার ছেলেকে রক্ষা করো। চোখের জল বাঁধ মানছে না ছেলের চিন্তাতে। এদিকে ছেলে ফিরতি ট্রেনে কলকাতায় ফিরে গেছে।
এমন ঘটনা হাতে গুনে শেষ করা যাবে না।আমার আপনার সকলের জানা। জানি এসব শুনতে কারো ভালো লাগে না। মানতে কষ্ট হয়, কিন্তু এই লাঞ্ছনা আর গ্লানির মালিন্য-এ কোন না কোন ভাবে তৈরি হচ্ছে অসম্মানের পাঁচালি!
‘হেল্প এজ ইন্ডিয়া’র পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা গেল অসম্মানের সংখ্যা ৫৮ শতাংশ; অবহেলা ২৮ শতাংশ, মারধর ৩২শতাংশ। কোলকাতার পরিসংখ্যানও কিন্তু ভালো নয়।
গত চল্লিশ বছর ধরে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছে ‘হেল্প এজ ইন্ডিয়া।’ তাদের বক্তব্য এই প্রজন্মের বেশ কিছু মানুষ আছে যাদের নিজস্বতা তৈরি হয়নি বা নিজেরা এতটা আত্মকেন্দ্রিক যে নিজের বাইরে ভাবতে ভুলে গেছে যে বাবা-মা তাদের অতি কষ্টে মানুষ করেছেন আর স্বপ্ন দেখেছেন সন্তান মানুষ হয়ে ভবিষ্যতের লাগাম ধরবে আর নিজেরা নাতি-নাতনিদের নিয়ে সুখে থাকবে না। কিন্তু হায়! পরিসংখ্যান আরো বলছে ৮২জন বৃদ্ধ বৃদ্ধা বলেছেন অভিযোগ করে কি লাভ? আমাদেরই তো সন্তান। ঐ যে বলে না কুসন্তান যদিবা হয়, কুমাতা কখনো নয়। তবে ১০জন কিন্তু বলেছেন ভবিষ্যত ওদের উত্তর দেবে।
পরিশেষে একথা বলি, যে হাতগুলি দিয়ে হাঁটতে শিখেছিলাম আজ সেই হাতগুলি বড় অশক্ত।যাদের প্রশ্রয়ে আদরে বকুনিতে আমাদের বড় হয়ে ওঠা, তাদের কেউ কেউ আজ শিশুসুলভ হতেই পারেন, বয়সের ভারে অসুস্থ হতে পারেন। তাদের দয়া করে হারিয়ে ফেলবেন না। পাশাপাশি এটা খেয়াল রাখতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সব দেখছে আর দেখেই বড় হচ্ছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!