কেন এই জাতীয় শিক্ষানীতি, সুগভীর আলোচনায় জয়ন্ত ভট্টাচার্য

জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনায়  দুয়েকটি কথা —- GATT (General Agreement on Tariffs and Trade) চুক্তি আদতে হয়েছিল ১৯৪৭-এ। এরই উত্তরসূরী হল ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশন (WTO)। GATT বা GATTS (General Agreement on Tariffs and Trade in Services) সুখ্যাত বা কুখ্যাত হয় উরুগুয়ে রাউন্ডের পরে ১৯৯৪ থেকে। উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনায় ১২৩টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। মুক্ত অর্থনীতি ও বাণিজ্য ছাড়াও নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় GATT-এর আওতায় চলে এলো, যেমন “services capital, intellectual property, textiles and agriculture”। শিক্ষাও চলে এলো এর আওতায়। ভারত সরকার ২০১৫ সালে নাইরোবিতে WTO-র নতুন কর্মসূচীতে স্বাক্ষর করে। মুক্ত বাজারের থাবা বিস্তৃত হল উচ্চতর শিক্ষায়, গবেষনায়, স্বাস্থ্যে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে।
এর সাথে মনে রাখবো নিওলিবারাল অর্থনীতির সাথে সঙ্গতি রেখে ২৯টি ইউরোপিয়ান দেশের স্বাক্ষরিত Bologna Process চালু হয় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাইভেটাইজেশনের ক্ষেত্রে, যেমন সরকারি জমি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কম বা নাম মাত্র দামে দিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কিভাবে ত্বরান্বিত করা যায় সে লক্ষ্যে। বর্তমানে স্বাক্ষর করা ইউরোপীয় দেশের সংখ্যা ৪৮। আরেকটা বিষয় আছে Bologna Process-এ। সেটা হল ৩০০ বছর ধরে ক্রমবিকশিত ইউরোপের সব দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ডার্ড চালু করা। ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি রূপায়নে এরও প্রভাব আছে। মুশকিল হল ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার ও জনবৈচিত্র্যের দেশে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অসাম্যের দেশে এই স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন শেষ অব্দি কতটা কার্যকরী হতে পারে এ নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
“জাতীয় শিক্ষানীতির”-র মূল বিষয়গুলোকে আমার ভাবনা অনুযায়ী পরপর সাজিয়ে নিই। একেবারে গোড়ার দিকে বলা হয়েছে – “The rich heritage of ancient and eternal Indian knowledge and thought has been a guiding light for this Policy. The pursuit of knowledge (Jnan), wisdom (Pragyaa), and truth (Satya) was always considered in Indian thought and philosophy as the highest human goal. The aim of education in ancient India was not just the acquisition of knowledge as preparation for life in this world, or life beyond schooling, but for the complete realization and liberation of the self.”

লক্ষ্যণীয়, প্রাচীন ভারতের পরেই বর্তমান ভারতে চলে আসা হয়েছে। মাঝখানে মধ্যযুগ বলে একটি আলাদা ঐতিহাসিক অংশ যে ইতিহাস জুড়ে আছে সেটার অস্তিত্বই অস্বীকার করা হল। আর প্রাচীন যুগ তো একমাত্রিক কবি-কল্পনায় রাঙ্গানো কোন সময়কাল নয়। বহু স্তরে স্তরায়িত এই প্রাচীন যুগ। যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে এর শুরুই বা কোথায় শেষই বা কোথায় তার কোন হদিশ পাওয়া যায়না। এক বায়বীয়, অনৈতিহাসিক সময়কাল শুরুতেই বিধৃত হল ইতিহাস হিসেবে। “The pursuit of knowledge (Jnan), wisdom (Pragyaa), and truth (Satya) was always considered in Indian thought and philosophy as the highest human goal” – এরকম এককথায় সেরে ফেলা প্রাচীন ভারতের গরিমা আমাদেরকে ধন্দে ফেলে দেয়। সত্যিই “প্রাচীন” ভারতের ইতিহাস এত পেলব, নিষ্কলুষ এবং সুকুমার ছিল? আমাদের ইতিহাসের সামগ্রিক পাঠ তো সেরকম কোন ইঙ্গিত দেয়না!

E, বেদান্তের দর্শন – তা ব্রাহ্মণ্যবাদ যতই বৌদ্ধস্তুপ ধ্বংস করুক না কেন। সামাজিক স্মৃতি থেকে তেভাগা, তেলেঙ্গানার কৃষক অভ্যুত্থান কিংবা দেশভাগের পঙ্কিল অধ্যায় মুছে দিতে হবে। নতুন স্মৃতির নির্মাণ করতে হবে।

সি এ বেইলি ১৯৯৫ সালে মডার্ন এশিয়ান স্টাডিজ-এ প্রকাশিত তাঁর “The Pre-history of ‘Communalism’? Religious Conflict in India, 1700-1860” প্রবন্ধে দেখাচ্ছেন যে প্রাক-উপনিবেশিক সময়ে ও সমাজে ধর্মীয় সংঘাত থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রেই, অন্তত ১৮২০ পর্যন্ত, তা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের চেহারা নিয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় দূরত্ব মানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এরকম কোন সরল সমীকরণ করার যাথার্থ্য নেই। তিনি ঐতিহাসিকভাবে উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যুদ্ধজীবী (warbands) রাজপুত শ্রেষ্ঠদের হারেমে মুসলমান রমণীদের রাখা হত। 3এবং এই প্রথা উলমাদের অসীম বিরক্তির কারণ ছিল। দেখিয়েছেন হিন্দুরা যেমন বহুক্ষেত্রে মসজিদ রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে, তেমনি মুসলমান সুলতানেরাও বহু মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এমনকি শিখেরা গুরুদ্বারের মধ্যে মসজিদও বানিয়েছে। জমি নিয়ে যুদ্ধ কিভাবে ‘সাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠলো? অনেক কারণের মধ্যে সম্ভাব্য একটি কারণ, বেইলির মতে, গোঁড়া জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী সাম্প্রদায়িকতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়।



কৃষণ চন্দরের “পেশোয়ার এক্সপ্রেস” গল্পটি একবার স্মরণ করি। পেশোয়ার এক্সপ্রেস এখানে একজন জীবন্ত চরিত্র হিসেবে নিজের মনে কাহিনী শোনায়। এক ট্রেন ভর্তি জবাই হওয়া হিন্দু ভারতে আসছে, ফিরতি ট্রেনে ট্রেনভর্তি হিন্দুদের হাতে কাটা মুসলিম দেহ নজরানা হিসেবে ফেরত যাচ্ছে। ট্রেনটি গোঙায়। অবশেষে সেই মেয়েটিকে পেয়ে গেলো দাঙ্গাবাজেরা – “মেয়েটি ওদের হাতে নিহত হল। জঙ্গলের শুকনো ঘাসের ওপর মেয়েটি ছটফট করতে করতে মারা গেল। আর তার হাতের বইখানা রঞ্জিত হল তারই দেহের রক্তে। বইটা ছিল সমাজতন্ত্র নিয়ে লেখা।” জন স্ট্র্যাচির Why You Should Be A Socialist। “সে তো নারী ছিল। হয়তো কারও প্রিয়তমা অথবা জননী। আর এখন সে এই জঙ্গলে পড়ে আছে লাশ হয়ে। শকুন আর শেয়ালেরা তার লাশ ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। সমাজতন্ত্র নিয়ে লেখা বইটা জানোয়ারেরা ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলেছে। বিপ্লবের দরজা আর কেউ খুলছে না। কেউ কিছু বলছে না।” মেয়েটি আজকের দলিতদের মতো নারী তো – পূর্ণ মানুষ আর হল কোথায়? কিভাবেইবা স্বাধীন ভারতের সম-অধিকারের নাগরিক হবে?



ওপরের ছবিগুলোকে স্মৃতিতে রাখা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষার পক্ষে অস্বস্তিকর। এ ইতিহাসের মাঝে লীন হয়ে আছে দুটি ধর্মের ঘাতকদের হাতেই অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও রক্তের দাগ। এরকম হলে “অপর” নির্মাণ করা কষ্টকর – কে কার “অপর”? এজন্য এ ইতিহাস যত তাড়তাড়ি ভোলা যায় তত ভালো। এর পরিবর্তে “ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে”-র ইতিহাস রচনার সার্বিক চেষ্টা হবে।
১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পরে শুরুতেই রামশরণ শর্মা, রোমিলা থাপার, বিপনচন্দ্র এবং অন্যান্যদের লেখা ইতিহাসের গ্রন্থ পাঠ্যতালিকা থেকে তুলে নিয়েছিল। ১৯৯৯-এ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপি-আরএসএস জোট, প্রফুল্ল বিদোয়াই-এর ব্যাখায়, “a veritable cultural counter-revolution in itself” শুরু করে। (“Nationalism gone berserk”, ফ্রন্টলাইন, ফেব্রুয়ারি ২, ২০০২) ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিক্যাল রিসার্চ, একটি সরকারি সংস্থা, খ্যাতনামা বামপন্থী ঐতিহাসিক সুমিত সরকার এবং কে এন পানিক্করের লেখা “টুয়ার্ডস ফ্রিডম”-এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়।
এনসিইআরটি-র সিলেবাসও বদলাতে শুরু করে। জানুয়ারি ২০০২-এ এনসিইআরটি স্কুলের ইতিহাস বই থেকে মধ্যযুগের অংশটি বাদ দিয়ে দেয়। মুশিরুল হাসান পূর্বোক্ত প্রবন্ধে বলছেন – “Attempts to Talibanise India’s history are exemplified in the deletion of certain passages from school textbooks of the Central Board of Secondary Education. These include references to, for example, beef eating practices, the martyrdom of the Sikh guru, and the ransacking of Delhi by the Jats.” এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার মতো রাষ্ট্রপন্থী সংবাদপত্রেও সম্পাদকীয় পর্যন্ত লেখা হয়েছিল – “that the deletions amount to an unprecedented violation of academic freedom. In a country where the lines between history and mythology are increasingly blurred, the dangers of such revisionism may not be immediately apparent. But we can ignore the old adage – those who forget their history are condemned to repeat it – only at our own peril.” (২৮ নভেম্বর, ২০০১)
কোভিডকালে সিলেবাস তথা ইতিহাসের পুনর্লিখন
সিবিএসই কোভিডজনিত অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দরুন উঁচু ক্লাসের সিলেবাস ৩০% অব্দি কমিয়ে দিয়েছে – একথা সবার জানা। বিশেষ কতকগুলো বিষয় এই ৩০%-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই চ্যাপ্টারগুলো হল – সেক্যুলারিজম, নাগরিকত্ব, জাতীয়তাবাদ, ফেডেরালিজম, ডিমনিটাইজেশন, গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক।
লক্ষ্যণীয়, “আন্ডাস্ট্যান্ডিং পার্টিশন” বলে একটি চ্যাপ্টার ছিল। মুছে গেছে। একেই বলে ইতিহাসের দ্রবীভূত হওয়া। আমরা দেশভাগের স্মৃতি নিয়ে খুব সামান্য আলোচনা করেছি। এখানে আরেকটু বলা যায়। সাধারণভাবে হিসেব করা হয় ৭৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০ নারী বা কিশোরী দেশভাগের সময় ধর্ষিত হয়েছে, খুন হয়েছে।
ঊর্বশী বুটালিয়ার The Other Side of Silence-এ oral history, personal narrative, government documents ইত্যাদি সব নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁর হিসেবে – “Twelve million people were displaced. Nearly one million died. Some 75,000 women were raped, kidnapped, abducted, forcibly impregnated by men of the ‘other’ religion, thousands of families were split apart, homes burnt down and destroyed, villages abandoned.” (p. 35) আরো মর্মান্তিক হল – “while abducted women then entered the realm of silence, women who were killed by families, or who took their own lives, entered the realm of martyrdom.” (p. 158) একদল নারীর যাত্রা পরম নৈঃশব্দে এবং বিস্মৃতিতে যাদের কোথাও কোন চিহ্ন নেই (স্রেফ মুছে গেলো), আরেকদল অর্জন করলো শহীদের মর্যাদা। স্বাধীনতার কি অট্টহাস্যময় পরিহাস!
বীণা দাস তাঁর “Transactions in the Construction of Pain” প্রবন্ধে জানাচ্ছেন – “The bodies of the women were surfaces on which texts were to be written and read – icons of the new nations.” কিন্তু বিপরীত ঘটনাও ঘটলো – “But women converted this passivity into agency by using metaphors of pregnancy…” নারী হবার কারণে তাকে ধর্ষিতা হতে হয়। আবার জারজ সন্তান গর্ভে ধারণ করার মধ্য দিয়ে তার মাতৃত্ব তথা সত্তা/identity তথা agency অর্জিত হয়। এ ছিল এক অদ্ভুত সন্ধিকাল। আজও আছে, শক্তভূমির ওপরেই আছে – ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন আখ্যানে, ভিন্ন version-এ।
বর্তমান বছরগুলোতে ইতিহাস নির্মাণের সময়ে এগুলো সযত্নে বাদ গেল। ২০১৯ পর্যন্ত সিবিএসই-র সিলেবাসে “Clothing: A Social History” বলে একটি চ্যাপ্টার ছিল। এখানে বলা ছিল – দক্ষিণ ভারতে দলিত নাদার জাতের উঁচু জাতের নায়ারদের সামনে উর্ধাঙ্গে কোন আবরণ রাখা বারণ ছিল। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবে যুগা যুগ ধরে চলে আসা এই প্রথা বন্ধ হয়। প্রকৃতপক্ষে, এরকম সব চ্যাপ্টার এবং আলোচনা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। কারণ এগুলো ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে যায়, দলিতদের আত্মানুসন্ধানে উৎসাহিত করতে পারে।
এখানেই সিলেবাস পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ফলাফল।
এরপরেও কি গণতন্ত্র বা সেক্যুলারিজম বা ফেডেরালিজম নিয়ে শিক্ষকেরা ছাত্রদের ক্লাসে পড়াতে পারবেন না? নিশ্চয়ই পারবেন। শুধু স্কুল থেকে বেরোলে দেখা যাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ইউএপিএ বা “দেশদ্রোহীর” তকমা।
[প্রসঙ্গত, আমি মেডিক্যাল সিলেবাসের পরিবর্তন নিয়ে এখানে বিস্তারে কিছু বলছিনা। শুধু এটুকু বলা যায়, ২০১৯ সালে মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া, সঠিক অর্থে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কাউন্সিল, “competency-based UG curriculum for the Indian Medical Graduates” শিরোনামে মেডিক্যাল সিলেবাসের আমূল পরিবর্তন করে। নতুন শিক্ষাক্রমে ২৯৩৯টি “কম্পিটেন্সির” কথা থাকলেও “General Practice” বা “Family Medicine” কিংবা “Family Physicians” শব্দগুলো একবারের জন্যও নেই। ভাঙ্গাচোড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্য থেকে এই বর্গগুলোও হারিয়ে গেলে কোটি কোটি মানুষের জন্য কি পড়ে থাকবে?]

  সৌজন্য: আবহমান

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!