মরণোত্তর দেহদানের থেকেও এখন অঙ্গদানের তাৎপর্য অনেক বেশি

সদিচ্ছা আর সচেতনতা দিয়ে এই সমাজে অনেক কিছুই করা যায়, লিখছেন সুজন ভট্টাচার্য



অঙ্গদান মানে হল নিজের শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গ অন্যের প্রয়োজনে দান করা। আমার শরীর থেকে সেই অঙ্গটি অপারেশনের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হবে। আর অন্য একজন রোগী যার শরীরের সেই অঙ্গটি বিকল হয়ে গেছে, তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হবে। কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে আমরা জানি। আমাদের শরীরে দুটি করে কিডনি থাকে। তাই জীবিত অবস্থাতেই আমরা একটি কিডনি অন্যের প্রয়োজনে দিতে পারি। কিন্তু হৃৎপিণ্ড বা লিভার কিন্তু আমরা দিতে পারব না। মানে জীবিত অবস্থায়। একমাত্র মৃত্যুর পরেই আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যু আমরা দান করতে পারি, যা বেশকিছু মৃতপ্রায় মানুষকে জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।

অঙ্গদান, নাকি দেহদান

ঘটনাচক্রে রক্তদান এবং মরণোত্তর দেহদান সচেতনতার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ অনেক এগিয়ে। অঙ্গদানের ক্ষেত্রে কিন্তু সেই কথা বলা যাবে না। মূল কারণ হল, অঙ্গদান নিয়ে প্রচার-আন্দোলন শুরু হয়েছে খুব অল্পদিন। যে কারণে এখনো অধিকাংশ মানুষই অঙ্গদান এবং দেহদানকে সমার্থক বলে মনে করেন। কিন্তু দুটো বিষয় একদমই আলাদা। মরণোত্তর দেহদানের ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেট চাই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করলে কর্নিয়া নেওয়া যাবে। আর শবদেহটি প্রয়োজন পড়ে ডাক্তারি ছাত্রদের হাতেকলমে শারীরসংস্থানের শিক্ষার জন্য। এবং সেইটুকুই। কিন্তু অঙ্গদানের পরিধি অনেক ব্যাপক। কিভাবে? আসুন দেখা যাক।

অঙ্গদানের পরিধি

একজন মৃত মানুষের শরীর থেকে যেসব অঙ্গ সরিয়ে নিয়ে অন্য একজনের দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়, তার তালিকা বেশ লম্বা –

১/ হৃৎপিণ্ড

২/ ফুসফুস (২)

৩/ লিভার

৪/ প্যাংক্রিয়াস

৫/ অন্ত্র

৬/ কিডনি (২)

এছাড়াও আছে বিভিন্ন টিস্যুর প্রশ্ন। যেমন –

১/ কর্নিয়া (২)

২/ আই বল (২)

৩/ লিগামেন্ট

৪/ টেন্ডন

৫/ হৃৎপিন্ডের ভালভ ইত্যাদি

একটি শরীর থেকে এতগুলো অঙ্গ এবং টিস্যু যদি অপসারিত হয়, তাহলে অবশিষ্ট শরীরটার অ্যানাটমি শিক্ষার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব আর থাকে না। ফলে দেহদান সেক্ষেত্রে নিরর্থক। কিন্তু সেই শরীরটাই কমপক্ষে আটজন মৃতপ্রায় মানুষকে নবজীবন ফিরিয়ে দিতে পারে, অন্তত ২জন অন্ধকে ফিরিয়ে দিতে পারে দৃষ্টিশক্তি, বেশকিছু পঙ্গু মানুষকে আবার সুস্থভাবে চলাফেরার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে, পারে কয়েকজন আগুনে পোড়া মানুষকে সুস্থ চেহারায় ফিরিয়ে দিতে। কাজেই মরণোত্তর দেহদানের থেকেও অঙ্গদানের তাৎপর্য অনেক বেশি।

অঙ্গদানের প্রক্রিয়া

অঙ্গদান দুভাবে হতে পারে, জীবিতাবস্থাতেই এবং মরণোত্তর। বোঝাই যায় জীবিত অবস্থায় একজন মানুষ খুব বেশি হলে একটি কিডনি এবং লিভারের একাংশ দান করতে পারেন। কিডনি দানের ঘটনা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। লিভারের কিয়দাংশ দানের ঘটনাও খুব কম হলেও শোনা যায়। কিন্তু অবশিষ্ট অঙ্গগুলো জীবিত অবস্থায় দান করা সম্ভব নয়। একমাত্র মরণোত্তর দানের মাধ্যমেই সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এবং সেক্ষেত্রেও মস্তিষ্ক মৃত্যু (Brain Stem Death) এবং শারীরিক মৃত্যু (Clinical Death) দুটো শব্দই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর স্তরভেদ

আগেই বলেছি মৃত্যুর দুটো পর্যায় থাকা সম্ভব, মস্তিষ্ক মৃত্যু এবং শারীরিক মৃত্যু। মস্তিষ্ক মৃত্যু মানে কোনো কারণে শরীরের মস্তিষ্কের ক্রিয়াশীলতা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতেও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা আর নেই। আমরা জানি আমাদের যাবতীয় সংবেদনশীলতাই নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। কাজেই মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবার অর্থই হল সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলা। সেই মানুষটির তখনো হৃৎপিণ্ড হয়তো দপদপ করছে, বাতাস টানছে ফুসফুস। কিন্তু আর কোনদিনই সে চোখ মেলে তাকাতে পারবে না। অবশিষ্ট সময়টুকু ভেন্টিলেটর কিংবা একমো মেশিনের সাহায্যেই তার হৃৎপিণ্ডকে সচল রাখতে হবে।

কোমা শব্দটি আমাদের জানা। এবং মস্তিষ্ক মৃত্যুর সঙ্গে এই কোমা শব্দটির ধারণা খুব কাছাকাছি। যদিও কোমা মানেই মস্তিষ্ক মৃত্যু নয়। কিন্তু মস্তিষ্ক মৃত্যুর আগে কোমা অবশ্যই হবে। এমন একজন মানুষের মস্তিষ্ক মৃত্যু হয়েছে কিনা, আইনানুযায়ী সেই বিষয়ে এককভাবে কোনো চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অন্ততপক্ষে চারজন চিকিৎসকের বোর্ড চার ঘণ্টা অন্তর দু বার বেশকিছু পরীক্ষা করার পরই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এবং Brain Stem Death হয়েছে বলে ঘোষণা করতে পারেন। প্রায়শই মস্তিষ্ক মৃত্যু ঘটে গেছে বোঝা গেলেও নানা কারণে ঘোষণা করা হয় না। অজ্ঞতা, পরিকাঠামোর অভাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর আছে আর্থিক চাহিদার কারণ। এমন একটি মানুষকে যদি আরো দিনচারেক ভেন্টিলেটরে রেখে দেওয়া যায়, তাহলে বিল বাড়ে, অনেকেরই লাভ হয়। পথ দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা অনেক বেশি।

শারীরিক মৃত্যু মানে হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। যদিও হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই Death Certificate দেওয়া হয় না। অন্তত চার ঘণ্টা অপেক্ষা করা হয়। তারপরই একজন চিকিৎসক Death Certificate দেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবশ্য মস্তিষ্ক মৃত্যু আর শারীরিক মৃত্যুর মধ্যে সময়ের ফারাক থাকে না। বাড়িতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে তো বটেই। কিংবা শারীরিক মৃত্যুই সরাসরি হয়। সেক্ষেত্রে মরণোত্তর দেহদান কার্যকরী হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ অঙ্গদানের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক মৃত্যুর ঘোষণা খুব জরুরী। একমাত্র সেক্ষেত্রেই যাবতীয় অঙ্গ (যদি সুস্থ থাকে) সংগ্রহ করা সম্ভব। এবং তার জন্য নির্দিষ্ট পরিকাঠামোসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজন।

মরণোত্তর অঙ্গদানের দুই পদ্ধতি

যদি কোনো মানুষের মস্তিষ্ক মৃত্যু হয়েছে বলে বোর্ড ঘোষণা করেন, তাহলেই তার নিকটাত্মীয়দের সম্মতিসাপেক্ষে যাবতীয় অঙ্গ সংগ্রহ করা সম্ভব। এমন ক্ষেত্রে প্রথম সার্টিফিকেটের পরই এই সম্মতি প্রয়োজন। তার জন্য সেই প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, সেই মানুষটির নিকটাত্মীয়দের সচেতনতা খুবই জরুরী। এই মানুষটিকে যে মাসের পর মাস ভেন্টিলেটরে রেখেও আর বাঁচিয়ে তোলা যাবে না, উভয় পক্ষেরই এই বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার। আর সেখানেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হল গণচেতনা বিকাশের লক্ষ্যে প্রচার আন্দোলন।

আবার যদি মস্তিষ্ক মৃত্যুর আগেই শারীরিক মৃত্যু ঘটে, সেক্ষেত্রেও কর্নিয়া, ত্বক, লিগামেন্ট, টেন্ডন ইত্যাদি সংগ্রহ করা সম্ভব। হ্যাঁ, কর্নিয়া বাড়িতেই নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো মানুষ এসে সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু বাকিগুলো বাড়িতে সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কোনো হাসপাতালের শরণ নিতেই হবে। এবং এগুলোর জন্য আহামরি পরিকাঠামোরও প্রয়োজন পড়ে না। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা আর সচেতনতা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!