যতীন্দ্রনাথ দাসের আত্মাহুতি ও ভগৎ সিং ,রাজগুরু,শুকদেবের ফাঁসি                

মিয়ানওয়ালি জেলে ভগৎ সিং রাজবন্দীদের সঙ্গে সম্মানজনক ব্যবহার, সংবাদপত্র ও বই পড়ার অধিকার,ইউরোপিয়ান বন্দীদের মতন একইরকম সুযোগসুবিধা ব্যবহারের দাবিতে অনশন শুরু করেন।স্যান্ডার্স হত্যার বিচারের জন্য তাঁকে ও শ্রীদত্তকে এইসময় লাহোর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।ওই জেলের রাজবন্দীরাও অনশন ধর্মঘট করছিলেন।তাঁদের ওজন ভীষণভাবে হ্রাস পায়। জওহরলাল জেলে গিয়ে অনশনরত বন্দীদের সঙ্গে দেখা করেন।তিনি তাঁর বিবৃতিতে বলেন:

              “এই নায়কদের কষ্ট দেখে আমি যন্ত্রনা পেয়েছি।তাঁরা রাজবন্দীদের প্রতি রাজবন্দীর মতন ব্যবহার চান।তাঁদের আত্মত্যাগ অচিরেই সাফল্যের মুকুট অর্জন করবে”।

             কিন্ত অনশনরত যতীন্দ্রনাথ দাসের অবস্থার খুবই অবনতি হয়।১৯২৯ এর ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনাবসান হয়।সারা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।প্রতিবাদে গোপিচাঁদ ভার্গব ও মহম্মদ আলম পাঞ্জাব বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করেন।পন্ডিত মতিলাল নেহরু সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এসেমব্লিতে সরকারের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করে মুলতুবি প্রস্তাব পাশ করান।যতীন্দ্রনাথের নশ্বর দেহ হাওড়া স্টেশনে নিয়ে আসা হলে বিশাল শোকমিছিল কেওড়াতলা শ্মশানে শবানুগমন করে।নেতাজি সুভাষচন্দ্র ও দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন শোকমিছিলে নেতৃত্ব দেন।জওহরলাল তাঁর বিবৃতিতে বলেন:

        “Another name has been added to the long and splendid role of the Indian Martyrs.Let us bow our heads and pray for strength to act to carry on the struggle,however long it may be and whatever consequences,till the victory is ours”.কংগ্রেস দল থেকে অনশন প্রত্যাহারের জন্য বিপ্লবীদের কাছে আবেদন জানানোর পর ভগৎ সিংহ তাঁর ১১২ দিনের অনশন প্রত্যাহার করেন।

     এরপরই দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে ভগৎ সিং ,রাজগুরু ও শুকদেবের প্রানদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।অন্য ১২ জন বিপ্লবীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ লাহোর জেলে তিন বিপ্লবীর ফাঁসি হয়।মহাত্মা গান্ধী তাঁদের প্রাণদণ্ড রদ করবার চেষ্টা করেন , কিন্তু ব্যর্থ হন।এরপরই ১৯৩১ এর মার্চে করাচিতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে তাঁকে বিক্ষোভের সম্মুখীন হতে হয়।গান্ধিজি ১৯৩১ এর ২৯ মার্চ তারিখে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকাতে ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ‘জাতীয় বীর’ বলে উল্লেখ করেন।তিনি লেখেন “তাঁদের প্রাণদণ্ড রদ করার জন্য আমাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।ভগৎ সিং রাষ্ট্রীয় হিংসার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি।তিনি অহিংসায় বিশ্বাসী ছিলেননা, কিন্তু অসহায়তার  জন্যই তিনি বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক পথ গ্রহণ করেছিলেন”। গান্ধিজি ইংরেজ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা করে লেখেন “এই বীরদের মুক্তির জন্য জাতির সর্বসম্মত প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে ইংরেজ সরকার এই দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনাকেও বিনষ্ট করেছে”।

            সুভাষচন্দ্র বলেন “ভগৎ সিং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক নবজাগরণের স্রষ্টা ,এক অগ্নিস্ফুলিংগ”।করাচি কংগ্রেস অধিবেশনে ভগৎ সিং,রাজগুরু ও শুকদেবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শোকপ্রস্তাব রচনা ও উত্থাপন করেন জওহরলাল।এই সময় বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে থাকেন।অনেককে নীরবে চোখের জল ফেলতে দেখা যায়।প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।এই অধিবেশনে ভগৎ সিং-এর পিতা সর্দার কিষান সিং উপস্থিত ছিলেন।তিনি তাঁর প্রেরণাদায়ক ভাষণে বলেন ” শেষ লড়াই এবার শুরু হবে।তাঁর ছেলে তাঁকে বলে গিয়েছে জাতির সেনাধ্যক্ষ গান্ধিজির নেতৃত্বে এই সংগ্রামে যেন সবাই যোগ দেয়।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!