উত্তরপ্রদেশে কি বিজেপি ফিরবে? আলোচনা করলেন অনিন্দ্য ভট্টাচার্য

উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, শাসক ও বিরোধী পক্ষ উভয়েরই রক্তচাপ বাড়ছে। কারণ, এখনও কেউ নিশ্চিত নয় যে এই নির্বাচনে কার দিকে সত্যি সত্যি পাল্লা ভারী। সম্প্রতি এবিপি-সি ভোটার একটি জনমত সমীক্ষা করেছে যেখানে এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি’র আসন গতবারের চেয়ে ৬০’এর মতো কমে গিয়ে ২৫০’র আশেপাশে দাঁড়াবে; আর সমাজবাদী পার্টি (এসপি)’র আসন গিয়ে ঠেকতে পারে ১২০’র কাছাকাছি। এই আভাস মোতাবেক, গতবারের তুলনায় বিজেপির ভোট ৫ শতাংশ কমছে ও এসপি’র ৫ শতাংশ বাড়ছে। তৎসত্ত্বেও, বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা যেখানে ৪০৩, বলাই বাহুল্য ২০২ হল সেই ম্যাজিক ফিগার যা এই সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপি অনায়াসে পার করে ফেলছে। তবে গোদি মিডিয়ার এইসব হিসেব-নিকেশে অনেকেরই বিশ্বাস নেই কারণ এই এবিপি নিউজ নাকি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-সমীক্ষায় বিজেপিকে ১৭৫টা পর্যন্ত আসন দিয়েছিল।

তাই এইসব হাবিজাবি সংখ্যাতত্ত্বে না প্রবেশ করে আমরা বরং উত্তরপ্রদেশের সম্ভাব্যতার রাজনীতির দিকে খানিকটা দৃষ্টি দিই। এই সম্ভাব্যতার রাজনীতি হল এমন এক পদ্ধতি যা দিয়ে আপনি ঘটনার উদীয়মান গতি-প্রকৃতিকে আন্দাজ করে একটা সম্ভাব্য ফলের আগাম পূর্বাভাস দিতে পারেন। সে ফল এই মূহুর্তে নির্বাচন হলে কী হতে পারে তা যেমন বলা সম্ভব, আবার পাঁচ মাস পরে নির্বাচন হলে কী হতে পারে তাও বলা যায়, যদি না অন্য কোনও বড় ফ্যাক্টর ইতোমধ্যে এসে হাজির হয় (যেমন যুদ্ধ বিগ্রহ বা উল্লেখযোগ্য কোনও নেতার মৃত্যু অথবা অর্থনীতিতে বড়সড় কোনও বিপর্যয়)।

উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে এই মুহূর্তে যে উপাদানগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে তার আলোকে কিছুটা তলিয়ে পরিস্থিতিকে বিচার করা যাক। নিঃসন্দেহে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী দিকটি হল গত দশ মাস ধরে চলা ঐক্যবদ্ধ কৃষক আন্দোলন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের নিরিখে এই আন্দোলন সে রাজ্যের পশ্চিম ভাগেই মূলত কেন্দ্রীভূত। এই ভাগে কতকগুলি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য আছে যা আগামী নির্বাচনে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রথমত, এখানে মূলত জাঠ, গুজ্জর ও মুসলমান জনসংখ্যার একটা আধিক্য রয়েছে। খুব পরিকল্পিত ভাবে এই জাঠ আর মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন ঘটিয়ে ২০১৩ সালে মুজাফরনগরে যে দাঙ্গা লাগানো হয়েছিল, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তার পুরো উশুল ঘরে তুলেছিল। আর সে ফায়দা তোলা তারা ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও বজায় রেখেছিল। কিন্তু আজ সে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন জাঠ-মুসলমানদের সমস্ত বিভাজন মুছে দিয়ে আজ ঐক্যবদ্ধ ভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর মুজাফরনগরে কৃষকদের যে মহাপঞ্চায়েত হয়ে গেল সেখানে সভার মঞ্চ থেকে রাকেশ টিকায়েত একই সঙ্গে আওয়াজ দিলেন: ‘আল্লা হো আকবর’ ও ‘হর হর মহাদেব’। ছবিটা স্পষ্ট: পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিজেপি আগত নির্বাচনে রীতিমতো কোণঠাসা।

দ্বিতীয়ত, জাতপাতের রাজনীতিতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা উত্তরপ্রদেশের এই পশ্চিমাঞ্চলে আরও কতকগুলি পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। এ তাবৎকাল জাঠ ভোট বিএসপি’র দিকে (২০১৪ সাল থেকে বিজেপি’র দিকে) যেত আর যাদব ও মুসলমান ভোট পড়ত এসপি’র ঝুলিতে। এবারে ছবিটা যেন বদলাতে চলেছে। বিএসপি যেহেতু একক ভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখলের নিরিখে তেমন বড় শক্তি কিছু নয়, তার ওপর বিভ্রান্তিকর ও দোদুল্যমান, তাই ভোট বিভাজন এড়াতে অধুনা তীব্র বিজেপি-বিরোধী জাঠ ভোট এবারে এসপি’র ঝুলিতে পড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়েছে। উল্লেখ্য, এখনও বিরোধী জোটের সম্ভাবনা তেমন স্পষ্ট না হওয়ার কারণেই পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের মানুষ এসপি’কে কেন্দ্র করেই বিজেপি-বিরোধী ভোটটাকে সংহত করতে চাইছে। যদিও এই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় লোক দল (আরএলডি) বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার সঙ্গে এসপি’র নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। আসন বন্টন নিয়ে এই দু’ দলে কোনও বিরোধ দেখা দিলেও জনতার চাপে হয়তো সে বিরোধ বেশি দূর গড়াবে না।

সেই সঙ্গে সামগ্রিক ভাবে উত্তরপ্রদেশে এও এক উল্লেখযোগ্য প্রবণতা যে, সেখানে অনেক ছোট ছোট দলের অস্তিত্ব রয়েছে যারা জাতপাত ভিত্তিক আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার কারণে কিছু কিছু আসনে নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন আরএলডি’র কথা বললাম; এছাড়াও আছে আপনা পার্টি, আজাদি সমাজবাদী পার্টি, জনবাদী পার্টি, গোন্ডোয়ানা গণতন্ত্র পার্টি, মহান দল ইত্যাদি ছাড়াও ওয়েসি’র মিম’এর মতোও একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। এই প্রত্যেকটি দলের রাজ্য জুড়ে নিজস্ব কিছু গণভিত্তি থাকার কারণে এদের সঙ্গে জোট গঠন খুব নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০১৭ সালের নির্বাচনে একক ভাবে বিজেপি তুমুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছোট ছোট কিছু দলের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া নিজেদের ভোট বাড়াতেও সহায়তা করেছিল। এবারে এইসব ছোট দলগুলির সঙ্গে এসপি’র একটা জোট গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তা বাস্তবায়িত হলে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ঘুরে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ প্রবল।

অনেকে বলছেন, বৃহত্তর বিরোধী জোটের সম্ভাবনা ক্ষীণ। অর্থাৎ, কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির মধ্যে কোনও নির্বাচনী জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। তা অনেকাংশেই ঠিক। কিন্তু ফলত এটা ভাবারও কোনও কারণ নেই যে এমনতর একটি পাটিগণিত-ভিত্তিক জোট গড়ে উঠলে তবেই বিজেপি’র সঙ্গে জোর লড়াই দেওয়া যাবে। প্রথমত, বিএসপি কতটা বিজেপি-বিরোধী তা নিয়ে বিরোধী দলগুলির সন্দেহের কথা না হয় ছেড়ে দিলাম; উত্তরপ্রদেশের আমজনতাও আর মায়াবতীকে বিশ্বাস করতে রাজী নয়। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের ওপরেও জনতার ভরসা নেই। এই জটিল পরিস্থিতিতে সমাজবাদী দলকেই বিরোধী পরিসরে প্রধান অক্ষরেখা হয়ে অন্যান্য ছোট ছোট দলগুলির সঙ্গে আপস-মীমাংসায় আসতে হবে। অন্তত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষক ও শ্রমজীবী জনতা এইভাবেই ভাবতে চাইছেন।

কিন্তু উত্তরপ্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিস্থিতি এখনও বিরোধীদের পক্ষে ততটা অনুকূল নয়। তা এই অর্থে নয় যে, বিজেপির ওপরে মানুষের এখনও ভরসা আছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সমাজবাদী পার্টির ভূমিকাতেও বহু মানুষ অতীষ্ট। ‘যাদবতন্ত্রের’ আতঙ্ক বহু মানুষের মন থেকে এখনও দূর হয়নি। শোনা যায়, একটা সময়ে উত্তরপ্রদেশে চল হয়ে গিয়েছিল, যে কোনও সরকারি দাক্ষিণ্য বা সুবিধা পেতে হলে কোনও যাদবের অনুমোদন ব্যতিরেকে তা আদায় করা রীতিমতো দুরূহ। এমত একটি জাতের আধিপত্যে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মানুষেরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। সে অন্যায়ের খেসারত এসপি’কে দিতে হয়েছে।

বলা হয়, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ বা পূর্বাঞ্চলে যে দলের আধিপত্য থাকবে লক্ষ্ণৌ’এর তখত তার হাতে আসবে। এই অঞ্চলে মোট আসন ১২৮ (৩১ শতাংশ)। গত ২০১৭ সালের নির্বাচনে বিজেপি এই অঞ্চল থেকে ৭৮টি আসনে জয়লাভ করেছিল। এখানে জাতপাতের রাজনীতির এক জটিল খেলা রয়েছে। কৃষক আন্দোলনের প্রভাব এখানে এখনও সীমিত। যদিও গত ফেব্রুয়ারি মাসে বারাবাকি জেলায় সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার উদ্যোগে মহাপঞ্চায়েত বসেছিল যেখানে লখিমপুর-খেড়ি, সীতাপুর, হরদৌ, ফৈজাবাদ, ফতেপুর জেলা থেকে বহু কৃষক অংশ নিয়েছিলেন। এখানে বিএসপি’র ব্রাহ্মণ-দলিত ভোটব্যাঙ্কের তত্ত্ব তাদের পক্ষে কতটা কাজে দেবে তা নিয়ে সকলেই সন্দিহান। সকলেই জানেন, বিজেপি’র হিন্দুত্ব রাজনীতির প্রভাব এখানে এক সময়ে তীব্র ভাবে পড়েছিল।

কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে এই মুহূর্তে উত্তরপ্রদেশেও যে তিনটি প্রশ্ন আলোড়ন তুলেছে তা হল: এক, কৃষক আন্দোলন; দুই, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষত ভোজ্য তেল ও এলপিজির; ও তিন, কোভিডের দ্বিতীয় প্রবাহে হাজার হাজার লোকের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। এই তিনটি প্রশ্নে আমজনতার ক্ষোভ, বিশেষ করে মহিলাদের, বেশ জোরালো। কিন্তু প্রশ্ন থাকছে, এই ক্ষোভ বিজেপি-বিরোধী ভোটবাক্সে পড়ে বিভাজিত হয়ে বিজেপিকেই সুবিধা করে দেবে না তো? উল্লিখিত এবিপি-সি ভোটার সমীক্ষায় বিজেপির প্রাপ্ত ভোট গতবারের থেকে যে ৫ শতাংশ কমে যাচ্ছে তা এসপি’র ঝুলিতেই জমা হচ্ছে বলে অনুমান। অর্থাৎ, এসপি জনতার স্বাভাবিক চয়নেই বিরোধী পরিসর হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিচ্ছে। এমতাবস্থায়, আরও বাড়তি ৫ শতাংশ ভোট যদি বিজেপির কমে যায় ও তা এসপি’র ঘরে জমা হয়, তাহলে বিজেপি’র আসন সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১৫০’এ আর এসপি’র ২১৯’এ। খানিক অবিশ্বাস্য মনে হলেও ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই অমূলক নয়। কারণ, জনতার হাতেই ভোট কৌশলের চাবিকাঠি থাকে এবং এক নীরব আন্তঃজনতা তরঙ্গ-প্রবাহের মধ্য দিয়ে তারা আপাত যুক্তিগ্রাহ্য পালাবদল ঘটায়। পশ্চিমবঙ্গ সে খেলা দেখিয়েছে যেখানে সমস্ত হিসেবকে ওলটপালট করে জনতা বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মত দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশও একই পথের পথিক হতে চলেছে। বিশেষ করে মহিলাদের ভোট নির্বাচনী ফলাফলে অত্যন্ত গভীর সূচক যার আভাস আমরা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে পেয়েছি। ঘটনাবলী যেদিকে মোড় নিচ্ছে, উত্তরপ্রদেশেও অধিকাংশ মহিলারা পরিবারের পুরুষদের নির্দেশকে অমান্য করেই ভোটের রাজনীতিতে অংশ নেবেন। আর তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়তে চলেছে বিজেপির বিপক্ষেই।

বলাই বাহুল্য, পাটিগণিতের হিসেবে নয়, নিছক বেঁচে থাকার তাগিদেই এবার উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে পালাবদল হতে চলেছে, যার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে দুর্বার কিষাণ আন্দোলন। তাই, বিগ মিডিয়ার আঙ্কিক তালগোলে হারিয়ে যাওয়া নয়, দেখতে থাকা যে, বিরোধী শিবিরের মূল কাণ্ডারী হতে চলেছে সমাজবাদী দল যার সঙ্গে অন্যান্য ছোট দলগুলির মোর্চা বিজেপির পরাজয়কে সুনিশ্চিত করবে। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলছে শ্রমজীবী জনতা যাদের অধিকাংশই আজ রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছে।

সৌজন্য: একক মাত্রা

3 comments:

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!