সিপিএম এতো ভুল করে কেন বারবার? আলোচনা করছেন সোমনাথ গুহ


রাজ্যের রাজনৈতিক অভিঘাতে সিপিএম কি এখন দিশেহারা? রাজ্য সম্পাদকের ‘বিজেমূল’ প্রসঙ্গে ভুল স্বীকার, বিমানবাবুর তৃণমূলের সঙ্গে ফ্যাসি-বিরোধী ঐক্যে কোনও আপত্তি না থাকা, ‘জাগো বাংলা’য় অজন্তা বিশ্বাসের নিবন্ধ- সবটা মিলিয়ে একটা হ য ব র ল কাণ্ড। আলোচনা করলেন সোমনাথ গুহ।প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলো একক মাত্রা ব্লগের সৌজন্যে।

সিপিএমের ভুল স্বীকার আর পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়া- এই দুটি বিষয়ের মতো নিয়মিত ও প্রত্যাশিত ঘটনা আমাদের দেশের রাজনীতিতে আর কিছু আছে কি? ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করা এই দলটির মজ্জাগত অভ্যাস। বিশেষ করে দুটি ভুল সম্পর্কে তো তাদের সীমাহীন আক্ষেপ: এক, ১৯৯৬’এ পার্টি যদি একবার জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনুমতি দিত তাহলে ভারতবর্ষ আজ নিশ্চিত ভাবে সমাজতন্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেত; দুই, ২০০৮’এ যদি ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া না হত তবে আজও পশ্চিমবঙ্গে তাদের মৌরসি পাট্টা, দাদাগিরি, ঘরে ঘরে খোচরগিরি বহাল থাকত। 

গত বিধানসভা নির্বাচনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার পর আবার এই ভুল স্বীকারের মরসুম উপস্থিত। যথারীতি এবারেও অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে তারা নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিল, বাহারি রামধনু-সম মোর্চা গড়েছিল। আমরাই ধর্মনিরপেক্ষ, আমরাই ভবিষ্যৎ, আমরাই বিকল্প ইত্যাদি বলে লম্বা-চওড়া ভাষণ মেরেছিল। ফলাফল বেরনোর পর যখন দেখা গেল ভাঁড়ে মা ভবানী, তখন আবারও সেই অজুহাতের বন্যা। কেউ বলল, মানুষ যদি সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে হরনাথ চক্রবর্তীকে শ্রেয় মনে করে আমাদের কী করার আছে; কেউ বলল, চাকরির চেয়ে মানুষের ভিক্ষার ঝুলি বেশি পছন্দ, হায় গণচেতনার কী অবনতি; তাদের হতাশা এতই চরমে পৌঁছল যে আর কোনও যুৎসই কারণ না পেয়ে তারা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ আর সিপিআইএমএল-লিবারেশনকে তাদের হারের জন্য দায়ী করল। এই দুই মঞ্চ ও দল এতে অবশ্য পুলকিত হওয়ার চেয়ে বিস্মিত বেশি, কারণ তারা নিজেরাও ভাবেনি বঙ্গের ভোটে তাদের এত গুরুত্ব আছে!  

প্রায় দু’ মাস বাদে স্বয়ং রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র এবার মুখ খুলেছেন। তিনি বললেন, বিজেপি ও তৃণমূলকে এক করে দেখা ভুল হয়েছে। বাইশ বছর আগে থেকেই এটা তাঁরা জানতেন, কারণ বিজেপির পিছনে আরএসএস’এর মতো একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি আছে। অবশ্য বিজেপি দলটা ফ্যাসিস্ট কিনা তা কিন্তু তাঁরা নির্দিষ্ট ভাবে বলতে নারাজ। বাইশ বছর ধরে জানা সত্ত্বেও তাঁরা কী করে এই ভুল করলেন? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো একাধিকবার সতর্ক করেছেন যে তৃণমূলকে হটাতে গিয়ে বিজেপির সঙ্গে সখ্য তপ্ত কড়াই থেকে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। ওনার কথা তো দলে বেদবাক্য। সেটাও তাঁরা বিস্মৃত হলেন? ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বারবার এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, হয়তো তার জন্যই বাংলার ভোটের প্রচারে তাঁকে সে ভাবে দেখাই যায়নি। 

সুর্যবাবু ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে দলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, যার ফলে দিদিভাই-মোদিভাই তত্ত্ব চলে আসে, বিজেমূল কথাটাও চলে আসে এবং আমরাও (পড়ুন নেতৃত্ব) সেটা ব্যবহার করে ফেলি। অর্থাৎ, সবই হয়ে যায় ঘটনার আকস্মিকতায়, কর্মী, সমর্থকদের স্বতঃস্ফুর্ততার কারণে সব ঘটে যায়, দলীয় নেতৃত্বের কোনও সচেতন সূত্রায়নের ফলে এসব ঘটেনি। তিনি এটাও বলেন যে দুটি পার্টিকে একই মুদ্রার দুটি পিঠ বলা হয়েছে, কিন্তু দুটি পিঠ হলেও সেটার তো একটা দিক হেড আরেকটা দিক টেল থাকে! বাহবা! এত তীক্ষ্ণ, অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণ কোনও মার্কসবাদী দল ইতিপূর্বে করেছে কিনা সন্দেহ আছে। যেটা লক্ষণীয়, উনি বারবার জোর দিচ্ছেন যে দুটি দলকে এক করে দেখার এই প্রক্রিয়াটা ঘটে গেছে, এটা দলীয় নেতৃত্বের কোনও সচেতন সিদ্ধান্ত নয়। আবার ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’- এটা তিনি বলছেন বিজেপি রটিয়েছে, এতে নেতৃত্ব তো বটেই, কর্মী সমর্থকদেরও কোনও দায় নেই। 

এর কিছুদিন পরেই বর্ষীয়ান নেতা বিমান বসু চমকে দিয়ে বললেন, জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁরা যে কোনও দলের সাথে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে রাজি আছেন। হতচকিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বারবার বললেন, গলা চড়িয়ে বললেন যে তাঁরা তৃণমূলের (শব্দটার ওপর জোর দিলেন) সাথেও যৌথ আন্দোলনে রাজি। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সর্বত্রই চিরকালই নাকি এটা তাঁদের স্ট্যান্ড ছিল। অনেকেই বলবেন, এই দলটা চিরকালই সব কিছু একটু দেরিতে উপলব্ধি করে। প্রশ্নটা হল, আদৌ তারা উপলব্ধি করে, না উপলব্ধি করার ভান করে? এই সন্দেহটা হয়, কারণ, এই দুই নেতার বক্তব্যে নানা ফাঁক তো আছেই এবং যতটুকু সার আছে সেটার সাথেও নীচুতলার প্রতিক্রিয়া আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

প্রথম কথা, বিজেপি-তৃণমূল এক নয় বলার পাশাপাশি সূর্যকান্ত মিশ্র এটাও কিন্তু বলছেন যে ২০০১ থেকে ২০১৬- সব নির্বাচনেই এদের মধ্যে আঁতাত ছিল। তাহলে ঐ নির্বাচনগুলিতে বিজেমূল বা দিদিভাই-মোদিভাই বা দিদিভাই-অটলভাই শ্লোগান এল না কেন? এইসব নির্বাচনে বিজেপির ভোট তো ছিল নগণ্য। তাহলে তারা কি নিঃস্বার্থ ভাবে তৃণমূলকে সাহায্য করে গেছে, এমনকি ২০১৪’এ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরেও? তাহলে তো বিজেপি দলটা অত্যন্ত মহানুভব বলতে হয়! সিপিএম’এর কথায়, এদের মধ্যে যদি সত্যিই সমঝোতা হয়ে থাকে তাহলে তৃণমূল লাভবান হয়েছে, তাদের শক্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ বিহার, অসম বা সর্বত্র দেখা গেছে যে এদের সাথে সমঝোতার ফলে স্থানীয় দলের শক্তি হানি হয়েছে। সুজন চক্রবর্তী তাঁর নেতাদের বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, তৃণমূল ঘাড়ে করে বিজেপিকে এই রাজ্যে নিয়ে এসেছে, সুতরাং তাদের সাথে বোঝাপড়ার কোনও জায়গাই নেই। এর উত্তরে বলা যায়, এমনটা নয় যে সিপিএম একেবারে সাত্ত্বিক, কোনওদিন বিজেপির সাথে গা শোঁকাশুঁকি করেনি। যাক গে ওসব পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। কিন্তু ২০১৯’র লোকসভা নির্বাচনের পরপরই সীতারাম ইয়েচুরি স্বীকার করেন, তাঁদের দলের বহু সমর্থক বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। সবার স্মরণে আছে যে এর ফলে সিপিএমের প্রায় ২০ শতাংশ ভোট বিজেপির ঝুলিতে যায় এবং তারা ১৮টা আসনে জয়লাভ করে। তাহলে কাঁধে করে কে নিয়ে এল সংঘীদের? এখানেও সিপিএমের যুক্তি আছে। ২০১৮’র পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাদের ওপর এত অত্যাচার হয়েছিল যে তারা সদলবলে বিজেপিকে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিল। অত্যাচারের ফলে একটা বামপন্থী দলের কর্মী সমর্থকরা পালটি খেয়ে যাবে? এত মেরুদণ্ডহীন? তাহলে তো বিহারে এতদিনে সিপিআইএমএল-লিবারেশন লুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। গত পঞ্চাশ বছরে তাদের তো সেখানে বারে বারে গণহত্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, হাজারও কর্মী শহীদ হয়েছেন। 

আসলে সিপিএম’এর বিপুল সংখ্যক কর্মী জীবনের শুরু থেকেই তাদের দলকে ক্ষমতায় আসীন দেখতে অভ্যস্ত। ১৯৭৭ সালে যখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে তখন পঞ্চাশের দশকের শেষে যাদের জন্ম তারা সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত। সংগঠন গড়ার জন্য তাদের আর নতুন করে প্রায় কিছুই করতে হয়নি। সব কিছু রেডিমেড পেয়ে গেছে। কংগ্রেসি কিছু নেতাদের হাত করে নেওয়ার ফলে তাদের সমর্থকরা অচিরেই ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। নকশালদের তারা নির্মম ভাবে দমন করেছে, তাতেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পুলিশ প্রশাসন দিয়ে কাজ হাসিল করেছে। এর ফলে পুরো সংগঠনটাই অমেরুদণ্ডি হয়ে গেছে, যার ফলে ২০১১’এ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেই পুরো সংগঠন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। প্রতিরোধ করা ব্যাপারটা সম্পর্কেই তারা ওয়াকিবহাল নয়, এটা তারা কোনওদিনও করেনি। ক্ষমতার বাইরে থাকা তারা ভাবতেই পারে না। এর জন্য যাঁরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যেমন ঋতব্রত বা ইদানীং অজন্তা বিশ্বাস, তাঁরা হয় দল পাল্টাচ্ছেন নয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুণগান করছেন।   

আরেকটা বিষয়- সিপিএম এমন একটা দল যারা সমস্যায় বা বিপদে পড়লে সব সময় তার মধ্যে চক্রান্তের গন্ধ পায়- বিরোধীদের চক্রান্ত, কেন্দ্রের চক্রান্ত, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, সিয়া! নকশালবাড়ি তো সিয়ার চক্রান্ত, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামও তাই, ‘দেখলে না ক্ষমতায় আসার পরই হিলারি ক্লিন্টন কীভাবে মমতার কাছে ছুটে এল’- এক্কেবারে নির্ঘাৎ প্রমাণ যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই আসলে ২০১১’এ তাদের পরাজয়ের মূলে ছিল। ‘আমরা যে ঐ পারমাণবিক চুক্তি আটকে দিয়েছিলাম’, সঙ্গে বিজ্ঞ হাসি। কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম তো ২০০৮’এর আগেই ঘটে গেছে! আরে ওরা সুযোগের জন্য ওত পেতে ছিল! আর সঙ্গে দোসর পেয়ে গেছে মিডিয়া, নকশাল সহ সমস্ত বিরোধীদের। এরা গতানুগতিক ভাবে অনুতাপ প্রকাশ করে, কিন্তু তা অন্তঃসারশূন্য; এদের অভিধানে অন্তর্দর্শন বা আত্মসমীক্ষা বলে কিছু নেই, কোনওদিন ছিল না।  

সিপিএম এখন দিশাহারা। কংগ্রেস সরে যাচ্ছে, তৃণমূলের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। লোকসভায় একটা আসনও যদি জিততে না পারে তাহলে তো ৪.৭ শতাংশ যে ভোট আছে সেটাও হরিবোল হয়ে যাবে। তাই তারা ছক করছে যদি একটু তৃণমূলের দয়াদাক্ষিণ্য হয়। কিন্তু কর্মীবাহিনী তো সেটা সহজে মানবে না। চৌত্রিশ বছর ধরে ’৭২ থেকে ‘৭৭-এর গল্প শুনিয়ে কংগ্রেসের সাথে গলায় গলায় হয়েছ, আবার তৃণমূলের সাথেও তাই হবে? বলা যায় না, এদের কর্মীদের যা হাল, টিকে থাকার জন্য হয়তো এটাও তারা মেনে নেবে। যদি অবশ্য মাননীয়া দয়া ভিক্ষা করেন!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!