Wednesday, July 28, 2021

অনলাইন লেখাপড়া নষ্ট করছে শৈশব,লিখছেন শিশু সুরক্ষা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

কিছু সুবোধ বালক- বালিকা রয়েছে, তাদের বাদ দেয়া যায় না। এদের প্রধান অংশ শিশু এবং তারা যথার্থই সুবোধ। তারা মেলায় গিয়ে কিনেছে নকল ঘড়ি, পাপড় বা লজেন্স। ঘড়ি পরে স্কুলে এলে বকুনি খেয়েছে। কমপিউটর তো দূর এরা যেন ক্যাল্কুলেটরও ব্যবহার না করে তা বলা হয়েছে বারবার ওদের অভিভাবকদের। সরকারি নির্দেশও তাই।
এখন তাদের বলা হচ্ছে অনলাইন ক্লাসে এসো। অভিভাবকেরা (যাদের সাধ্য আছে) তাদের পাঠাচ্ছে প্রাইভেট টিউটরের কাছেও, অনলাইনে শিক্ষা নিতে বা কিনতে। আর, সবারই এখন চাই স্মার্টফোন। চাই ঘরের পাশে মোবাইল টাওয়ার! না পারলে এদের বকুনি, এমনকি এদের ওপর নির্যাতন করার ভার নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন অভিভাবকেরা। শিশুর অধিকার ও অভিভাবকের ইচ্ছায় তীব্র সংঘাত বেধেছে। অথচ, শিশুদের ওপর কোনরকম অত্যাচার বা নির্যাতন হোক তা আমরা চাই না এবং বিদ্যালয় চৌহদ্দিতে তা আইনত নিষিদ্ধ। তবে গৃহাভ্যন্তরে? এই পর্বে বা অন্য সময়েও Domestic Violence বাড়লেও শিশু সুরক্ষায় আইন নীরব।
এই শিশুরা এমন অনলাইন ব্যবস্থায় স্বাভাবিক শৈশব হারাচ্ছে, মেলামেশা বন্ধ। এতে তাদের যে সাংঘাতিক ক্ষতি হচ্ছে তা সকলে বলছে। বলছেন অভিভাবকরা, মনোবিজ্ঞানীরা, অভিজ্ঞ শিক্ষকরা, চিকিৎসকরা। যে বলে বলুক, সরকার সেসব কথায় কান দিলে তো। বিচারালয়ও কান দেয় না। বিচারালয় তাদের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে বড় সুবোধদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তার সাম্প্রতিক এক রায়ে। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে বলে নি শিক্ষকরাও ভালো নেই।
এক এক রাজ্য সুবোধদের প্রয়োজন, অভিভাবকদের চাপ ইত্যাদি বিবেচনা করে মূল্যায়ণের আয়োজন করেছে এক এক রকম, যা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত মাথা ঘামাতে রাজি নয়। যত মাথাব্যথা যেন এক শ্রেণীর অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের। সুবোধরা যে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ কেন, দেশের কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারছে না। নিশ্চয় তা খুব দুঃখের, যদিও সকলে জানে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ১০-১২ শতাংশের বেশী উচ্চশিক্ষা লাভে এগোতে পারে না। তাতে কী, যারা এগোতে চায় তারা কারা, তাদের বংশগৌরব হেলাফেলা করার সাধ্য আছে কার?
দেশের সর্বোচ্চ আদালতও পারে না তা অগ্রাহ্য করতে এবং বুঝি চায় না এমন প্রতিভার অপচয়। চায় না ভবিষ্যতের ‘বিধান রায়’ বা অক্সফোর্ড -কেম্ব্রিজের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে যে সব প্রতিভা তারা করোনা ভয়ে কেবল গৃহকোণে বসে থাক।
সর্বোচ্চ আদালত শুধু চায় ৩১জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের মূল্যায়নের কাজ শেষ করে তার চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হোক। ছেলেমেয়েরা যেন হতাশায় না ভোগে।
সুপ্রিম কোর্ট যেন কোন রাজ্য সরকারকে খুব বকেছে এমন ভয়ানক সময়ে তারা পরীক্ষা নিতে চেয়েছে বলে!
মুশকিল আমাদের, আমরা যারা মাথা ঘামাতে চাই। যে কোনও মূল্যায়নে আমরা তুষ্ট হতে পারি কী? চাই কি যে মুড়ি মুড়কি এক হোক! চাই কি? ধরা যাক সামনে একটি রামছাগল রেখে প্রশ্ন করা হলঃ ওটি কী বলো?
কেউ লিখল ওটি রাম, কেউ লিখল ছাগল। দুজনেই দশে দশ পেলে মুড়ি-মুড়কি এক হয়ে যাবে যে! ( অবশ্য দুটোর কোনটাই – মুড়ি বা মুড়কি – কোনও সুস্থ জীবের নিয়মিত খাদ্য হতে পারে না)। আর যে লিখবে ওটি একটি নির্ভেজাল রামছাগল তাকে কত দেবেন? সমস্যা কার বা কাদের?
প্রতিবাদ করতে শেখেনি সুবোধ বালক-বালিকারা। তাদের হতাশা, মানসিক সমস্যা, সুবোধ বালক-বালিকারা ক্লাসের ফাকে ফাকে খুনসুটি করে কিনা এসব যেন মহামান্য আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। তারা কেবল জানতে চায় সুবোধদের লেখপড়ার সুযোগ বা আয়োজন অবাধ হল কি হল না? সুবোধরা অশিক্ষিত থাকবে নাকি? সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবার কেউ তা চায় না। তাই তাদের শিক্ষিত করে তুলতেই হবে যে কোনও মূল্যে। কেমন হবে সে শিক্ষা? কতকাল আগে শোনা গেছে রাষ্ট্র চায় শিক্ষিত নাগরিক, চায় না আলোকপ্রাপ্ত (enlightened) নাগরিক। রাষ্ট্র কোনকালেই চায়নি সুশিক্ষা যা সু-নাগরিক গড়বে। অতিমারী-কালে, অন্তত, অভিভাবকদের একাংশকে দেখছি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এদের লেখাপড়া শেখাতে। কেমন লেখাপড়া? সুশিক্ষা? নাকি, উচ্চশিক্ষা তথা চাকরিতে প্রবেশের শিক্ষা?
অধিকাংশ শিশু-কিশোর-যুবক-যুবতীরা অত শত বোঝেন না, এই মুহূর্তে জানতেও চান না। সমস্যা বাধবে যখন তারা জানতে চাইবে। যারা জানতে চান না বা যাদের জানতে দেওয়া হয় না প্রধানত তাদেরই একাংশ হচ্ছে বাল্যবিবাহের শিকারও। প্রধানত মেয়েরা। এই দেশের মনীষীরা কবে থেকে বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে বলছেন, লিখছেন তবু তো কিছু হচ্ছে না। আইন করেও কিছু হচ্ছে না।
শিশু সুবোধদের (শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়্য ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু) আরও কত সমস্যা। যেমন পাচারের সমস্যা। সামাজিক মাধ্যমের( Social Media) সাহায্য নিয়ে, ফুসলিয়ে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কতজনকে ঠকানো হয়েছে – তবু শিক্ষাদানের নামে আমরা তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিতে চাই। সবসময় তো ক্লাস থাকে না( থাকা সম্ভবও নয়, যেমন’কবির ঘর-গেরস্থালি’ থাকে তেমন শিক্ষকেরও ঘর-গেরস্থালি থাকে), কিন্তু নেশা থাকে। তাই অবসরে এরা যদি ফেসবুক বা তেমন কিছু ঘাটে, যদি ‘নীল ছবি’ দেখে কে আটকায়। সাহায্য করতে আছে চাইল্ডলাইনের হেল্পলাইন। ক’জন জানে সে নম্বর? জানাতে সরকারি উদ্যোগ কৈ?

- Advertisement -
- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Popular Articles

error: Content is protected !!