Wednesday, July 28, 2021

দেশদ্রোহী আইনের কি আজও আর প্রয়োজন আছে? কেন্দ্রকে প্রশ্ন শীর্ষ আদালতের

মোক্ষম প্রশ্ন তুললেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর এখনো কি রাষ্ট্রদ্রোহ আইন এই দেশে জরুরি? অর্থাৎ দেশের মানুষ ষড়যন্ত্র করছে সরকার উৎখাত করার জন্য, এটাকি স্বাধীন ভারতে বর্তমান অবস্থায় আদৌ সম্ভব? এই আইনের বাস্তবিক কার্যকারিতা নেই কারণ সরকারের সঙ্গে দ্বিমত হতে পারে কোনো নাগরিক কিন্তু সরকারকে ষড়যন্ত্রমূলক কাজ কর্মের মধ্যে দিয়ে উৎখাত করার মত কোন কাঠামোগত পরিবর্তন করা একটি স্বাধীন দেশের সেই নাগরিকদের পক্ষে কি সম্ভব যেখানে ৭৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের অনুষ্ঠান হচ্ছে? এই মৌলিক প্রশ্নগুলি ছিল এই সময় সবচাইতে জরুরি প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নগুলোর তুলে দিয়ে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক।

- Advertisement -

মনে রাখা দরকার একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে তার নাগরিকের সম্পর্কটা মূলত বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে এই দুই শর্তে আবদ্ধ থাকবে। তবেই রাষ্ট্রব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়া সম্ভব। একে উভয়ের স্বার্থে সামগ্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করে তোলা সম্ভব। এখনো ভারত থেকে যে সমস্ত নাশকতামূলক কাজ কর্ম বিভিন্ন রাজনৈতিক নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে ঘটে চলে সেগুলো আসলে যতটা রাষ্ট্রবিরোধী তার চাইতে বেশী রাষ্ট্রকে সতর্কতামূলক। অর্থাৎ ইরাক সিরিয়াতে যেভাবে একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত অন্য একটি গোষ্ঠী, ভারতবর্ষের তেমন কোন গোষ্ঠী সংঘর্ষের অস্তিত্ব নেই। ক্ষমতা দখলের জন্য এখানে মাওবাদীরা তাত্ত্বিকভাবে সংগ্রাম চালাচ্ছে কিন্তু সেই ক্ষমতা তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা যতনে বেশি তার থেকে বেশি প্রয়োজন আর্থসূচক। আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার মূল প্রয়োজনীয় শর্ত গুলি আদায়ের দাবিতে তাদের জমি জংলা জঙ্গলে চলে অধিকার রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়েও রাষ্ট্রের দায় থাকে নাগরিকের সুবিধার্থে উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যে দিয়ে সকলকে সর্বত্র ভালো রাখা। দেশের প্রাকৃতিক এবং অর্থনৈতিক সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য আদিবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট বনাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড লাগাম পরাতে বিধি রয়েছ সংবিধানে। তাই মাওবাদীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপের সমর্থন না করেই বলা যায় তাদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ চলে মূলত নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার গুলি আদায়ের লক্ষ্যে। সমস্ত নাগরিক যদি সেগুলো পায় তাহলে মাওবাদী হবে কি কেউ ? বাহুবলী কার্যকলাপ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাই যতনে বেশি সিআরপিএফ মোতায়েন করা দরকার তার থেকে বেশি তৈরি করা দরকার উন্নয়নমূলক কাজ এবং নিত্য রোজগারের প্রকল্প। সকল সরকারি প্রকল্পে সম্যক সুবিধা যদি তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখা দরকার। রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে ওঠার প্রবণতায় তাহলে ভাটা পড়ে যাবে। প্রকারান্তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এই দিকেই লক্ষ্য দিতে বলেছেন। যদি এমন ভাবে নাগরিক কল্যাণে সরকার পরিচালনা করা হয় তাহলে রাষ্ট্রের মধ্যে কার দায় পড়েছে রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে ওঠার?

কার্যত এইসব আইনের প্রয়োজন হয় যেখানে কোন রাষ্ট্র উপনিবেশ গড়ে তোলে। সেখানে স্বার্থগত ভাবি সি উপনিবেশ লুন্ঠন করাটাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে চালু থাকা সরকারের মূল কাজ। সভাপতি সেই পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত হতে সেখানকার আদিম অধিবাসীরা বাধ্য হয় সেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাত করার। ফলের শুরু হয় রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যক্রম ও ষড়যন্ত্রমূলক গোষ্ঠীভিত্তিক সক্রিয়তা। এমন পরিস্থিতিতে সেই উপনিবেশ নিজের দখলে রাখবার জন্য সেই ভিনদেশী সরকার তখন স্বাধীনতা উন্মুখ নাগরিককে দমন করতে এই ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহ আইন প্রণয়ন করে। কার্যত এইসব কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আজ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ভারত সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, আদৌ কি এই আইন আর দরকার আছে দেশে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও ? খুব স্পষ্ট ভাবেই তাই তারা বললেন:
“রাষ্ট্রদ্রোহ আইন ঔপনিবেশিক আইন, ব্রিটিশরা ভারতীয়দের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য প্রয়োগ করত”।


দেশদ্রোহ আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে এবার কেন্দ্রকে সওয়াল করল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানা ও বিচারপতি এএস বোপান্না এবং বিচারপতি হৃষিকেশ রায় দেশদ্রোহ আইনের একাধিক আবেদনের শুনানি একই সঙ্গে করছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, ‘‘আমরা জানি না সরকার কেন এখনও এই আইন নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। প্রাচীন আইন নিয়ে সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’’দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানতে চেয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আইন কতটা প্রয়োজনীয়, কতটা বৈধ ভাবে তার প্রয়োগ হচ্ছে? দেশদ্রোহ আইনকে ঔপনিবেশিক আইন হিসাবে তকমা দিয়ে শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, ব্রিটিশরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা আইন প্রয়োগ করতেন। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে বাল গঙ্গাধর তিলকের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা হয়েছে।” স্বাধীন দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে কি এই আইন প্রয়োগ করবার কোন যৌক্তিকতা আছে?


সুপ্রিম কোর্টের আরো প্রশ্ন, “স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর কি এই আইনের আর কোনও প্রয়োজন রয়েছে?” এই আইন নিয়ে কেন্দ্রের জবাব চেয়েছে শীর্ষ আদালত। জানিয়েছে, এই আইনের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা হবে।

এদিন বিচারপতিদের বক্তব্য, “আমাদের মূল চিন্তার বিষয় হল যে কোনো আইনের অপপ্রয়োগ আটকানো এবং আইনটির বৈধতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা।” সাম্প্রতিককালে বিনোদন জগৎ থেকে সাংবাদিক, নেতা-মন্ত্রী, সমাজকর্মীদের বিরুদ্ধে এই আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। অনেকে জেলেও গেছেন। এই আইনের বৈধতা নিয়েই এবার তাই প্রশ্ন তোলার সময় এসে গেছে এই মত শীর্ষ আদালতের।

- Advertisement -
- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Popular Articles

error: Content is protected !!