Wednesday, July 28, 2021

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও কোভিড : এই শিক্ষায় শিশুরা কতটা বিপন্ন, আলোচনা করছেন রাজ্য শিশু সুরক্ষা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্ত



বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কিছু প্রশ্ন এসে পড়েছে সামনে। সৌজন্যঃ কোভিড। প্রশ্নগুলি এই রকমঃ ১. অতি সুবোধ বালকদিগের ভবিষ্যৎ কী? ২. কর্পোরেট কী শিক্ষাব্যবস্থা গ্রাস করতে চলেছে? ৩. ‘নক্সাল’ আমলে শিক্ষাব্যবস্থা কী থমকে গিয়েছিল?
গোড়াতেই বলে রাখি World economic Forum -এর সমীক্ষায় আমার আস্থা নেই। কেন নেই সে প্রসঙ্গ ভিন্ন, তাই সে আলোচনা এখন অন্তত এখানে নয়। কেবল এটুকু বলি, তারা gdp বাড়াতে বেশি চিন্তিত। তারই জন্য শিক্ষা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা, তারা তাই ‘ look East policy’ নিয়ে ভাবিত।
ওদের কথা থাক, এখানে আমরা কেবল প্রশ্নগুলির উত্তর খুজি এক এক করে।

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বূঝে নিতে চাই এই সুবোধ বালক কারা? আপাতত যারা মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মুখে। তারাই তো প্রধান।
এই সুবোধরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো ভালো চাকরি খোজেন IT ও অন্য সেক্টরে। যারা নানা পেশায় নিযুক্ত হবার স্বপ্ন দেখেন তাদের অনেকেই চান উচ্চশিক্ষা। সংশয় আমার মূলত দুটোঃ ১. এরা চায় নাকি এদের অভিভাবকেরা চান? ২. এরা বা এদের অভিভাবকেরা কী সুশিক্ষা চান?
প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে সর্বাগ্রে এসে পড়ে সেই প্রশ্নঃ কাকে বলে সুশিক্ষা?
অভিভাবকদের প্রধান চিন্তা, খুব স্বাভাবিক নিয়মে, সন্তান যেন দুধে-ভাতে থাকতে পারে। তারা সুশিক্ষা কাকে বলে তা জানেন না এমন নয়। এও জানেন ‘মানুষ’ হওয়া কাকে বলে। তবু নিজের সন্তানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ তা প্রায়শ ভুলে থাকেন। আমি যেখানে থাকি সেই সল্টলেকে ‘মানুষ’ হওয়া ছেলে-মেয়েরা অধিকাংশ দেশে বা রাজ্যে থাকেন না, এখানে পড়ে থাকেন বৃদ্ধ -বৃদ্ধা।
এই সল্টলেকের কিনারায় থাকেন ‘মানুষ’ না হওয়া অন্য কিছু ছেলে-মেয়েও, বাপ-মা’র গলগ্রহ হয়ে। একদিন দেখি দুই দলের প্রতিনিধি স্থানীয় দুই বৃদ্ধের মধ্যে বেধেছে প্রবল তর্ক। একপক্ষ বলছে, আমার ছেলেটা মানুষ হয়নি। এপাড়া ওপাড়া, শ্মশানে হাসপাতালে ঘুরে বেড়ায়, মস্তানি করে। শুনছি নাকি পরের বার নির্বাচনে দাঁড়াবে। পুলিসও যে আজও কেন ধরে নি!
অন্যজন বলল, ঠিকই করেছে পুলিস। তোমার ছেলের মতো ছেলে আছে বলেই না তোমার বউদির জন্য ডাক্তার, এম্বুলেন্স জুটল সহজে। আমার ছেলেটা তো কিছু টাকা পাঠিয়েই ভাবল তার দায় মিটল। তোমার ছেলেকে পুলিস আটক করলে এই সব আর কে করবে?
কোনও পক্ষকে সমর্থন না করে, আমি বাড়ি ফিরি জন্ম-নিয়ন্ত্রণ বিধির জয়ধ্বনি দিতে দিতে। অন্য আড্ডায় অন্য এক বন্ধুজনকে জিগ্যেস করি, বলতো এমন ক্ষেত্রে কোনও পক্ষকে সমর্থন করা যায়? সেও ঘাড় হেলিয়ে বলল, পাগল! এরপর ওরা একজোট হয়ে যদি তোমায় পেটায়? শোন তবে –
আর একটা গল্প শুনতেই হল।
তার বাড়িতেই থাকে চার পুত্র তার, তিন বউ। একজন বিয়ে করেনি। চার পুত্র চার পার্টিতে, বউরা তিন পার্টিতে। মেজো বউ চায় ওরা সবাই আসুক তার পার্টিতেই। এই নিয়ে নিত্যদিন ঝামেলা। এখন ফের অন্য ঝামেলা জুটেছে। দলবদলে যে গেছে মেজো বউএর দলে তাকে অন্যরা খেপায় ‘দলবদলু’ বলে। সারা দিন কেবল রাজনীতির কচকচি, অথচ কেউ কুটোটি নাড়ে না। একদিন ওদের একজনকে বলেছি, এতো সিগ্রেট খাস না আর সেলোফেন প্যাকেট যত্রতত্র ফেলিস না। সে তো তেড়ে এল। যেন মারবে। মারতে চায় সিগ্রেট কোম্পানিগুলোকে, হাতের কাছে তাদের পায় না তাই বাপকেই পেটাতে চায়। অন্য পুত্ররা বা পুত্রবধূরাও, অনেকেই ছিল সামনে, কেউ বাধা দিতেও এগোয় না। এগোবে কে? কেন? এক পুত্র ইংরেজি সাহিত্যের এম এ, বব ডিলানের গানের ভক্ত, অথচ ডিলানের বানানটাও জানে না। অন্যজন ড্রাইভিং শিখেছে, কিন্তু ড্রাইভারের কাজ করতে সে লজ্জা পায়। আর শুনবে?
জানি না বললেও সে শোনাবেই। তাই বললাম, আর যেটি তোমাকে মারতে ধেয়ে এল? সে কী করে?
– তার কথাই তো বলছি। আমার মেজো পুত্তুর। সে গুণধরটি আবার কর্পোরেশনের কাকে কিছু দিয়েটিয়ে একটা নাকি গুমটি ম্যানেজ করেছে। তার নাকি ক্যাচ আছে। তাই তাকে সবাই বেশ সমীহ করে। সেটাই সব। শ্রদ্ধা, ভালবাসা, দায়িত্ববোধ কিছুই নেই। থাকতেও নেই! এই তো শিক্ষা। একজন তো আরও ডিগ্রি নিতে বা বলতে পারো ডিগ্রি কিনতে বাইরে যাবার জন্য তোড়জোড় করছিল। আমাকে বলে কিনা লোন নাও। আমার থেকে উতসাহ না পেয়ে ঘাড় গুজে বাড়িতেই পড়ে রয়েছে। তার দাবি আমাকেই সব করতে হবে। কী করতে হবে? না, লোন করে বা বাড়ি বেচে তাকে টাকা যোগাতে হবে। উনি কেবল রাজাউজির মারবেন। অন্য ভায়েরাও তার জন্য কিছু করবে না। ভাববেও না। কিছু বুঝলে? তবে সে বেটা সামনে ছিল বলেই বুঝি সেদিন মানসম্মান বেচে গেল। গুণধর পুত্র আমার থেমে গেল।

আমি ছোটবেলায় ওদের দেখেছি। সবাই বেশ সুবোধ বালক ছিল। আর আজ কেউ তারা অন্তত সুবোধ নেই। এমন কিছু সুবোধ বালক/বালিকার পরীক্ষায় যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে কিছু মানুষ কাতর হয়ে পড়েছেন। তাতে কতটা ক্ষতি তাদের মানে ঐ সুবোধদের?
তারা পাশ করেই অনেকে চাকরি খুজবেন। অনেকে উচ্চশিক্ষার্থে যাবেন। তারাও মনের মতো চাকরি খুজবেন। ভালো মাইনের চাকরি। পাবেন না(সারা পৃথিবীতেই চাকরি কম, এদেশেও। যদিও একালে এই দেশে চাকরির সুযোগ বেড়েছে।)। দোষ কার খুজবেন তারা। খুজবেন রাষ্ট্রের দোষ কতটা? বাজারের দোষ!
সমাজের অবশ্যই বিপুল ক্ষতি, কিন্তু তা আর ভাবছে কে?
এমন নয় যে এরাই কেবল সুবোধের দলে। আরও ছোটরাও যে আছে। তাদের কথাও ভাবব না?
তাদের কথা ভাবতে ভাবতে ফিরছি, হঠাৎ দেখি সেই বন্ধুজন, দৌড়তে দৌড়তে সামনে এসে পড়েছেন৷ হাফাচ্ছেন। খানিক পাশাপাশি হেটে, দম নিয়ে বললেন, ভাই আমার একটা উপকার করো। তোমার তো অনেক চেনাজানা, আমার ছোটছেলেটার জন্য একটা কাজ জুটিয়ে দাও। ওর জন্য আমি আর খরচ করতে পারছি না। ও ডাক্তার হয়নি, ইঞ্জিনিয়ার হয়নি, কিন্তু ওতো সন্ত্রাসবাদীও হয়নি। এটাও ভাবো।
নিজের সন্তান বলে কথা!
[10/07, 23:50] Ashokendu Sengupta: 2nd Instalment
দ্বিতীয় পর্ব
আরও কিছু সুবোধ বালক- বালিকা রয়েছে, তাদের বাদ দেয়া যায় না। এদের প্রধান অংশ শিশু এবং তারা যথার্থই সুবোধ। তারা মেলায় গিয়ে কিনেছে নকল ঘড়ি, পাপড় বা লজেন্স। ঘড়ি পরে স্কুলে এলে বকুনি খেয়েছে। কমপিউটর তো দূর এরা যেন ক্যাল্কুলেটরও ব্যবহার না করে তা বলা হয়েছে বারবার ওদের অভিভাবকদের। সরকারি নির্দেশও তাই।
এখন তাদের বলা হচ্ছে অনলাইন ক্লাসে এসো। অভিভাবকেরা (যাদের সাধ্য আছে) তাদের পাঠাচ্ছে প্রাইভেট টিউটরের কাছেও, অনলাইনে শিক্ষা নিতে বা কিনতে। আর, সবারই এখন চাই স্মার্টফোন। চাই ঘরের পাশে মোবাইল টাওয়ার! না পারলে এদের বকুনি, এমনকি এদের ওপর নির্যাতন করার ভার নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন অভিভাবকেরা। শিশুর অধিকার ও অভিভাবকের ইচ্ছায় তীব্র সংঘাত বেধেছে। অথচ, শিশুদের ওপর কোনরকম অত্যাচার বা নির্যাতন হোক তা আমরা চাই না এবং বিদ্যালয় চৌহদ্দিতে তা আইনত নিষিদ্ধ। তবে গৃহাভ্যন্তরে? এই পর্বে বা অন্য সময়েও Domestic Violence বাড়লেও শিশু সুরক্ষায় আইন নীরব।
এই শিশুরা এমন অনলাইন ব্যবস্থায় স্বাভাবিক শৈশব হারাচ্ছে, মেলামেশা বন্ধ। এতে তাদের যে সাংঘাতিক ক্ষতি হচ্ছে তা সকলে বলছে। বলছেন অভিভাবকরা, মনোবিজ্ঞানীরা, অভিজ্ঞ শিক্ষকরা, চিকিৎসকরা। যে বলে বলুক, সরকার সেসব কথায় কান দিলে তো। বিচারালয়ও কান দেয় না। বিচারালয় তাদের মনোভাব স্পষ্ট করে দিয়েছে বড় সুবোধদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তার সাম্প্রতিক এক রায়ে। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে বলে নি শিক্ষকরাও ভালো নেই।
এক এক রাজ্য সুবোধদের প্রয়োজন, অভিভাবকদের চাপ ইত্যাদি বিবেচনা করে মূল্যায়ণের আয়োজন করেছে এক এক রকম, যা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত মাথা ঘামাতে রাজি নয়। যত মাথাব্যথা যেন এক শ্রেণীর অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের। সুবোধরা যে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ কেন, দেশের কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে পারছে না। নিশ্চয় তা খুব দুঃখের, যদিও সকলে জানে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ১০-১২ শতাংশের বেশী উচ্চশিক্ষা লাভে এগোতে পারে না। তাতে কী, যারা এগোতে চায় তারা কারা, তাদের বংশগৌরব হেলাফেলা করার সাধ্য আছে কার?
দেশের সর্বোচ্চ আদালতও পারে না তা অগ্রাহ্য করতে এবং বুঝি চায় না এমন প্রতিভার অপচয়। চায় না ভবিষ্যতের ‘বিধান রায়’ বা অক্সফোর্ড -কেম্ব্রিজের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে যে সব প্রতিভা তারা করোনা ভয়ে কেবল গৃহকোণে বসে থাক।
সর্বোচ্চ আদালত শুধু চায় ৩১জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যের মূল্যায়নের কাজ শেষ করে তার চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হোক। ছেলেমেয়েরা যেন হতাশায় না ভোগে।
সুপ্রিম কোর্ট যেন কোন রাজ্য সরকারকে খুব বকেছে এমন ভয়ানক সময়ে তারা পরীক্ষা নিতে চেয়েছে বলে!
মুশকিল আমাদের, আমরা যারা মাথা ঘামাতে চাই। যে কোনও মূল্যায়নে আমরা তুষ্ট হতে পারি কী? চাই কি যে মুড়ি মুড়কি এক হোক! চাই কি? ধরা যাক সামনে একটি রামছাগল রেখে প্রশ্ন করা হলঃ ওটি কী বলো?
কেউ লিখল ওটি রাম, কেউ লিখল ছাগল। দুজনেই দশে দশ পেলে মুড়ি-মুড়কি এক হয়ে যাবে যে! ( অবশ্য দুটোর কোনটাই – মুড়ি বা মুড়কি – কোনও সুস্থ জীবের নিয়মিত খাদ্য হতে পারে না)। আর যে লিখবে ওটি একটি নির্ভেজাল রামছাগল তাকে কত দেবেন? সমস্যা কার বা কাদের?
প্রতিবাদ করতে শেখেনি সুবোধ বালক-বালিকারা। তাদের হতাশা, মানসিক সমস্যা, সুবোধ বালক-বালিকারা ক্লাসের ফাকে ফাকে খুনসুটি করে কিনা এসব যেন মহামান্য আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। তারা কেবল জানতে চায় সুবোধদের লেখপড়ার সুযোগ বা আয়োজন অবাধ হল কি হল না? সুবোধরা অশিক্ষিত থাকবে নাকি? সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবার কেউ তা চায় না। তাই তাদের শিক্ষিত করে তুলতেই হবে যে কোনও মূল্যে। কেমন হবে সে শিক্ষা? কতকাল আগে শোনা গেছে রাষ্ট্র চায় শিক্ষিত নাগরিক, চায় না আলোকপ্রাপ্ত (enlightened) নাগরিক। রাষ্ট্র কোনকালেই চায়নি সুশিক্ষা যা সু-নাগরিক গড়বে। অতিমারী-কালে, অন্তত, অভিভাবকদের একাংশকে দেখছি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এদের লেখাপড়া শেখাতে। কেমন লেখাপড়া? সুশিক্ষা? নাকি, উচ্চশিক্ষা তথা চাকরিতে প্রবেশের শিক্ষা?
অধিকাংশ শিশু-কিশোর-যুবক-যুবতীরা অত শত বোঝেন না, এই মুহূর্তে জানতেও চান না। সমস্যা বাধবে যখন তারা জানতে চাইবে। যারা জানতে চান না বা যাদের জানতে দেওয়া হয় না প্রধানত তাদেরই একাংশ হচ্ছে বাল্যবিবাহের শিকারও। প্রধানত মেয়েরা। এই দেশের মনীষীরা কবে থেকে বাল্যবিবাহের কুফল নিয়ে বলছেন, লিখছেন তবু তো কিছু হচ্ছে না। আইন করেও কিছু হচ্ছে না।
শিশু সুবোধদের (শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়্য ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু) আরও কত সমস্যা। যেমন পাচারের সমস্যা। সামাজিক মাধ্যমের( Social Media) সাহায্য নিয়ে, ফুসলিয়ে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কতজনকে ঠকানো হয়েছে – তবু শিক্ষাদানের নামে আমরা তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিতে চাই। সবসময় তো ক্লাস থাকে না( থাকা সম্ভবও নয়, যেমন’কবির ঘর-গেরস্থালি’ থাকে তেমন শিক্ষকেরও ঘর-গেরস্থালি থাকে), কিন্তু নেশা থাকে। তাই অবসরে এরা যদি ফেসবুক বা তেমন কিছু ঘাটে, যদি ‘নীল ছবি’ দেখে কে আটকায়। সাহায্য করতে আছে চাইল্ডলাইনের হেল্পলাইন। ক’জন জানে সে নম্বর? জানাতে সরকারি উদ্যোগ কৈ?

- Advertisement -
- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Popular Articles

error: Content is protected !!