Wednesday, July 28, 2021

এক স্বামীর আত্মত্যাগ , নৃশংস প্রশাসন ও নির্লজ্জ রাজনীতি

কোনো বিবেকহীন সরকার দেশে থাকতে পারে না

- Advertisement -

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

স্ট্যান স্বামীর নাম স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে লেখা থাকবে।এই দেশ যে সত্যিই আজও নাগরিককে স্বাধীনতা দিয়ে মর্যাদার জীবন দিতে পারে নি তার প্রমাণ হল তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে দিয়ে। মৃত্যুর সাত দিন আগেও বিচারকের কাছে হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেছিলেন এরপর আমি হয়তো আর বাঁচবো না আমাকে জামিন দিন।
বিচারক কি সত্যি নিরুপায় ছিলেন? যে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগে তাকে জাতীয় তদন্তকারী এজেন্সি (NIA) গ্রেপ্তার করে নিজেদের হেফাজতে রাখার কথা  সেদিনও বলে সওয়াল করেছিল, বিচারক তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারতেন , যে সত্যিই কি ফাদারকে কোনদিন জেরা করা হয়েছে? না। তথ্য বলছে,জেলে তদন্তের স্বার্থে তাঁকে রাখার প্রয়োজনের কথা বারবার বলেছে NIA, কিন্তু একদিনের জন্যেও তাঁকে জেরা করা হয় নি।জেরা ছাড়াও কোনোদিন সত্যি কি  একবারের জন্যও তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি কোন কাজে লেগেছে? নাকি খালি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে একজন ৮৪ বছরের বৃদ্ধকে জেলে পুরে রাখা? একই বিরোধীরা  রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবার কথা বলছেন। সরকার নিশ্চই তাহলে এবার বিবৃতি দিয়ে জানাবেন যে কিসের জন্য তাঁদের এইভাবে আটকে রাখার জন্য এত প্রয়োজন ছিল? সাধারণ নিপীড়িত আদিবাসীর কল্যাণে যাঁরা কাজ করছেন তাদের এভাবে আটকে রাখা কি সরকারের ব্রত?

দ্বিতীয়ত,যে আচরণ ফাদার স্ট্যানের সঙ্গে করা হয়েছে সেটা এক অর্থে বর্বরোচিত।
ভারতবর্ষের কোন আইনে আছে একজন বন্দীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা যায়? সেই বন্দি যদি রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগেও অভিযুক্ত হন, তাহলেও কি সম্ভব সেটা? সারা পৃথিবীতে এই নিয়ে সুস্পষ্ট রীতিনীতি নিয়ম নির্দেশিকা রয়েছে। একজন বন্দি যখন তদন্তের স্বার্থে রয়েছেন জেল হেফাজতে তখনো তিনি কিন্তু কেবলই অভিযুক্ত কোন প্রমাণ তার বিরুদ্ধে নেই যেটাকে বলা যায় তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী। স্ট্যান স্বামীর জীবনযাত্রার মধ্যেও কোন রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছিল না। তার মৃত্যুর পরেও ভারত রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতা হলো না তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে প্রমাণ করার। অথচ তাকে মরতে হলো এই অভিযোগে আটক থাকার পর নির্মম প্রশাসনের চরম অবহেলায়। পারকিনসন রোগে আক্রান্ত এই অশীতিপর বৃদ্ধকে জল খাওয়ার জন্য দিতে চায় নি জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি। এত নিষ্ঠুরতা বোধহয় রাজীব গান্ধীর হত্যাকারী সঙ্গেও ঘটেনি।
এই নিষ্ঠুরতার কারণ কি? তিনি আদিবাসী কল্যাণে নিয়োজিত একমাত্র এটাই কি? এই দেশের সরকারগুলির কর্পোরেট মুনাফায় নির্দিষ্ট উন্নয়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন জল জমি বন-বাদাড় সাফ করা এবং সেইখানে লুকিয়ে থাকা মহা মূল্যবান খনিজ সম্পদ কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া। ঐতিহাসিকভাবে যেহেতু এই জঙ্গলে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আদিবাসীরা সেহেতু ভারত রাষ্ট্রের চরম শত্রু এখন তারাই। সত্য এটাই যে আদিবাসী অধিকারের জন্য যারাই লড়াই করছেন এখন তারাই এই কারণে দেশের শত্রু। তারা বলছেন জলের দরে দেশের সম্পদ বেসরকারি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। লক্ষ্য লক্ষ্য কোটি টাকার এনএমডিসি প্রকল্পের খনি গুলি সম্পদ যে সমস্ত এলাকায় কর্পোরেটের হাতে চলে যাচ্ছে এবার যেতে পারে বলে পরিকল্পনা রয়েছে সেখানেই আদিবাসী কল্যাণ এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যারা আছেন তাদেরকে সরিয়ে দেওয়াটা রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হয়ে গেছে। এটা শুধুমাত্র বিজেপি সরকারের বিষয় নয়। উদারনীতি যেদিন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে সেদিন থেকেই এই নিরবিচ্ছিন্ন আক্রমণ চলছে। মনে আছে নিশ্চয়ই সামান্য মিথ্যে অভিযোগ খাড়া করে এমনই এক ফাদার গ্রাহাম স্টেন্সকে দুই পুত্র সহ জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। তারও কোনো সুবিচার হয়নি। আর এখন মারা গেলেন ফাদার স্ট্যান।বিচারের নামে তাঁকে আটকে রেখে দিনের পর দিন একটু একটু করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর কৌসুলি বারবার বিচারকের কাছে দরবার করেছেন ।কিন্তু তাঁকে ছাড়া হয় নি।কারণ? এই পারকিনসন আক্রান্ত করোনা বিধ্বস্ত অশীতিপর বৃদ্ধটি নাকি মাওবাদীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভারত রাষ্ট্রে অভ্যুত্থান করবেন আর ভীমা কোরেগাঁও মামলায় এলগার পরিষদের সেই সমাবেশে হয়ে যাওয়া সংঘর্ষে নাকি প্রধানমন্ত্রীকে খুন করার চক্রান্ত ছিল আর সেই চক্রান্তের সঙ্গে যোগ রয়েছে নাকি এনার। সবই ‘নাকি’, এসবই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের পোষ্য জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সির নিজস্ব অনুমান।এই অনুমানের ভিত্তি কি? তারা নিজেরাও সেটা জানাতে পারেননি! যে সমস্ত নথি প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছিলেন সেটাও জানা গেছে ফরেনসিক পরীক্ষায় মিথ্যা যোগসাজশপূর্ণ।  সাজানো।
এতদিন কোনো রাজনৈতিক দল এই সমস্ত কথাগুলো বলবার জন্য  ভীমা কোরেগাঁও – এলগার মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাশে এসে দাঁড়ায় নি। এমনকি ফাদার স্ট্যান্ড যখন করুণভাবে বিচার প্রার্থনা করছেন, তখনো গোটা দেশের কোনো অঙ্গ রাজ্যের  রাজনৈতিক দল বা সরকার বা বিচার ব্যবস্থার মধ্যে থেকে কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার জামিনের পক্ষে এসে দাঁড়ায় নি। কেন এই মামলায় বিনা প্রমাণে রাষ্ট্র কাউকে আটকে রাখবে, সেই প্রশ্ন তুলে কেউ সুয়োমোটো মামলা করেননি। লড়াই যা কিছু করতে হয়েছে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাদের বন্ধু আত্মীয় স্বজন পরিবার করে গেছে। আজ ফাদার স্ট্যানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি দরবারে গিয়ে দলবেঁধে গিয়ে হাজির হয়েছে বিরোধী শিবিরের নেতা নেত্রীরা। হাজির হয়েছে তাঁরা এই ইস্যুতে যতটা সম্ভব রাজনৈতিক মুনাফা ঝুলিতে  তোলা যায় তার জন্য। সামনে নির্বাচন। বিজেপি বিরোধী হাওয়া তুলতে তাদের সুবিধা। অবশ্যই বিজেপির বিরুদ্ধে এক্ষেত্রে বলার মতন তাদের অনেক কিছুই ছিল। অনেক আগে থেকেই উচিত ছিল। সেসব কথা কি এখন ফাদারের মৃত্যুর পর মনে পড়লো? এক সর্বত্যাগী মানুষের কল্যাণে ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নিবেদিত সৈনিকের মৃত্যুকে এভাবে কলুষিত না করলেই কি আর নয়?  যাঁকে জীবদ্দশায় বাঁচানোর চেষ্টা  করে নি ইচ্ছে করে চুপ থেকে, লজ্জা লাগে না এখন তাঁর মৃত্যু নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হতে।না।কারণ সেটাই ভোট।এখন ফাদারের লক্ষ অনুগামী ক্ষোভে ফুঁসছে।তাদের ভোট দরকার।ছত্তিশগড়ের রাজনীতিতে তিনি থাকবেন , তিনি আছেন ।দাবার ঘুঁটির মতোই এখন চলবে তাঁকে ব্যবহারের।কিন্তু কেউ ফিরেও তাকাবে না সেই আদিবাসী সমস্যা আর দাবিদাওয়ার প্রতি, যাঁর জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত।
সত্যিই যদি এই মৃত্যু আমাদের কাঁদিয়ে থাকে, তাহলে অসমুদ্র হিমাচল গর্জে উঠে বলুক, বিনা বিচারে আটকে রাখা যাবে না।কোনো বন্দীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা যাবে না।অবিলম্বে বাতিল করতে হবে কেন্দ্রের দানবীয় আইন,UAPA।

কোনো বিবেকহীন সরকার দেশে থাকতে পারে না।

- Advertisement -
- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Popular Articles

error: Content is protected !!